১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসে গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের রাস্তায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যায়। ইসরায়েলি সামরিক ট্রাকের ধাক্কায় চারজন ফিলিস্তিনি শ্রমিক নিহত হন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি দুর্ঘটনা মনে হলেও, দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা অপমান, বঞ্চনা আর ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার জন্য এই একটি স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট ছিল।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনের মানুষের মাঝে গণঅভ্যুত্থানের জন্ম হয়, ইতিহাসে আমরা সেটাকে চিনি ‘প্রথম ইন্তিফাদা’ নামে। আরবি ‘ইন্তিফাদা’ শব্দের অর্থ ‘জেগে ওঠা’, যা ছিল আক্ষরিক অর্থেই ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণের জেগে ওঠার ঘটনা।
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক শাসনের অধীনে বাস করছিল। জমি দখল, অবৈধ বসতি স্থাপন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ তাদের আত্মমর্যাদাকে একদম নিঃশেষ করে ফেলেছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন কোনো সমাধান দিতে ব্যর্থ, তখন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। জাবালিয়ার ঘটনাটি ছিল সেই সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
প্রথম ইন্তিফাদার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি ছিল এর স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্র। এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ডাকা সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল না, বরং ছিল সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ। জাবালিয়া ক্যাম্পের সেই ঘটনা সব শ্রেণীর মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছিল। হাতের কাছে যা পাওয়া যায়- পাথর, গুলতি আর বোতল দিয়েই তারা ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু করে।
ইসরায়েলি ট্যাংক আর সাঁজোয়া যানের সামনে কিশোর-তরুণদের পাথর ছোড়ার দৃশ্য খুব দ্রুতই এই আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। এই অসম লড়াইয়ের ছবি বিশ্বজুড়ে মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এর মধ্যে দিয়ে প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার চিত্রটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কেন্দ্রে চলে আসে।
তবে এই আন্দোলন কেবল পাথর ছোড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল এক অত্যন্ত সমন্বিত এবং সুসংগঠিত অসহযোগ আন্দোলন। ‘ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিডারশিপ অব দ্য আপরাইজিং’ (UNLU)-এর মতো ভূগর্ভস্থ নেতৃত্বের মাধ্যমে আন্দোলনকারীরা লিফলেট বিলি করত৷ এই লিফলেটের মাধ্যমে সেখানে ধর্মঘট, ইসরায়েলি পণ্য বর্জন এবং কর প্রদান বন্ধ করার মতো কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।
ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি প্রশাসনকে অচল করে দিতে চেয়েছিল। তারা ইসরায়েলি আদালতের বদলে নিজেদের মধ্যে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে বিবাদ মেটাত। এরপর ইসরায়েলিরা স্কুল বন্ধ করে দিলে বাড়ির ভেতরে গোপনে স্কুল চালাত এবং নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করত। এটি শুধুই একটি বিদ্রোহ ছিল না, বরং একটি বিকল্প সমাজ ও প্রশাসন গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে।
ইসরায়েল এই গণ-অভ্যুত্থান দমনে কট্টর নীতি গ্রহণ করে। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একটি কুখ্যাত উক্তি ছিল, “হাড় ভেঙে দিয়ে হলেও এই আন্দোলন থামাতে হবে।” ইসরায়েলি সেনারা ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। জনসাধারণের চলাচল সীমিত করে দেয়ার জন্য কারফিউ জারি করা হয়। অন্যায়ভাবে অসংখ্য বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করে দখলদার সেনারা।
প্রথম কয়েক বছরেই এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশই ছিল শিশু ও কিশোর। হাজার হাজার মানুষকে বিনা বিচারে আটক করা হয়। কিন্তু এভাবে ফিলিস্তিনিদের মনোবল দুর্বল করে ফেলা সম্ভব হয়নি। ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর দমন-নিপীড়ন যত বাড়ছিল, ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধও তত দৃঢ় হচ্ছিল।
প্রথম ইন্তিফাদার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বছরের পর বছর ধরে চলা বৈষম্য, নিপীড়ন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিল। আন্তর্জাতিকভাবে এই অসম লড়াই ইসরায়েলের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্বজুড়ে এক ধরনের সহানুভূতি তৈরি হয়। এই চাপের মুখেই শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল এবং প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (PLO) আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়, যার ফলস্বরূপ ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ সম্মেলন এবং পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের অসলো শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও অসলো চুক্তি শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিতে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু প্রথম ইন্তিফাদা প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, সামরিক শক্তি দিয়ে একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে দাবিয়ে রাখা যায় না।
তথ্যসূত্র
১) The first Intifada against Israel
২) What you need to know about the 1987 Intifada
৩) Palestinians wage nonviolent campaign during First Intifada, 1987-1988