Ridge Bangla

ডোপামিন ডিটক্স: প্রযুক্তির আসক্তি থেকে মুক্তির টোটকা

বর্তমানে আমাদের প্রায় সবারই দিনের শুরুটা কীভাবে হয়? অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা হাতে নেই আমরা। এরপর শুরু হয় অন্তহীন স্ক্রলিং- ফেসবুকের নিউজফিড, ইনস্টাগ্রামের রিলস, ইউটিউবের শর্টস। কাজের ফাঁকে একটু সুযোগ পেলেই আবার সেই ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে নেই আমরা। নোটিফিকেশনের একটা শব্দ কানে এলেই মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে যেন মনে হয়, যেন ফোনটা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, আমরা ফোনকে নয়। এই যে একটা স্থায়ী  অস্থিরতার মধ্যে বসবাস করছি আমরা, মনোযোগের অভাবে ভুগতে হচ্ছে আর ছোট ছোট বিষয়ে আনন্দ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আর। এর পেছনের মূল কারিগর হলো আমাদের মস্তিষ্কের এক রাসায়নিক, যার নাম ডোপামিন।

​ডোপামিনকে অনেকেই ‘আনন্দের হরমোন’ বলে চেনেন, এই হরমোন আমাদের আনন্দ দেয়। কিন্তু আদতে এর আসল কাজটা আরও গভীরে। এটি মূলত আমাদের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় বা পুরস্কারের লোভে আমাদের কাজ করতে যেটা উৎসাহিত করে, সেটাই ডোপামিন।

সমস্যাটা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্মার্টফোন অ্যাপগুলো এই ডোপামিন সিস্টেমকে হ্যাক করার জন্যই ডিজাইন করা হয়েছে। প্রতিটি লাইক, কমেন্ট, শেয়ার বা নতুন কন্টেন্ট আমাদের মস্তিষ্কে এক একটা ছোট্ট ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়। এই তাৎক্ষণিক পুরস্কার পেতে পেতে আমাদের মস্তিষ্ক এতে আসক্ত হয়ে পড়ে।

​ফলাফল? বই পড়া, প্রকৃতির মাঝে হাঁটা, কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে গল্প করার মতো স্বাভাবিক ও ধীরগতির আনন্দগুলো আর ভালো লাগে না। কারণ, এসব কাজে মস্তিষ্ক অত দ্রুত ও তীব্র ডোপামিন পায় না। আমাদের মস্তিষ্ক তখন আরও বেশি উদ্দীপনা খুঁজতে থাকে। একজন মাদকাসক্ত আরও মাদকের জন্য ছটফট করে, তেমনই আমাদের মস্তিষ্কও অস্থির হয়ে পড়ে। এই চক্রের পরিণতি হলো মনোযোগ কমে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, এমনকি বিষণ্ণতা।

এই প্রযুক্তিগত আসক্তির জাল থেকে বেরিয়ে আসার একটি কার্যকর উপায় হিসেবেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ডোপামিন ডিটক্স’ বা ‘ডোপামিন ফাস্টিং’-এর ধারণা। নামটা শুনে কঠিন মনে হলেও, বিষয়টা আসলে বেশ সহজ। ডোপামিন ডিটক্স মানে ডোপামিন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া নয় (কারণ এটা অসম্ভব এবং শরীরের জন্য ক্ষতিকর), বরং এর মানে হলো– মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে এমন সব কাজ থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিরতি নেওয়া। অনেকটা শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য উপোস করার মতো৷ একে বলা যেতে পারে মস্তিষ্কের উপোস।

​ডোপামিন ডিটক্সের সহায়তা নেয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। প্রথম কাজ হলো খুঁজে বের করা কোন অ্যাপ বা প্রযুক্তি আপনার সবচেয়ে বেশি সময় নষ্ট করছে। সেটা হতে পারে সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন গেমিং, পর্নোগ্রাফি বা অপ্রয়োজনীয় অনলাইন শপিং। প্রথমবারেই লম্বা সময়ের জন্য সব বন্ধ করে দেওয়ার দরকার নেই। শুরু করা যেতে পারে দিনের নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টা দিয়ে। যেমন, ঠিক করুন, আজ সন্ধ্যায় ২-৩ ঘণ্টা কোনো ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকাবেন না। ধীরে ধীরে এই সময়টা বাড়িয়ে একটি পুরো দিনে নিয়ে যান।

ডিটক্সের সময় প্রচণ্ড একঘেয়ে লাগতে পারে। ফোনটা হাতে নেওয়ার জন্য মন আঁকুপাঁকু করতে পারে। এই একঘেয়েমিটাই হলো আসল নিরাময়। এই সময়টাতেই আপনার মস্তিষ্ক নিজেকে ‘রিসেট’ করার সুযোগ পায়। স্ক্রিনের বদলে এমন কিছু করা যেতে পারে যা আপনার মস্তিষ্ককে শান্ত রাখে। যেমন—একটি কাগজের বই পড়ুন, ডায়েরি লিখুন, ছবি আঁকুন, বাদ্যযন্ত্র বাজান, মেডিটেশন করুন বা কোনো ধরনের ব্যায়াম করুন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্ক্রিন ছাড়া সময় কাটান, গল্প করুন, বাইরে যান, হাঁটুন। প্রকৃতির সবুজ, আকাশ আর বাতাস আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে সাহায্য করবে। এটি ডোপামিনের স্বাভাবিক মাত্রা ফিরিয়ে আনতে দারুণ কার্যকর।

​ডোপামিন ডিটক্সের অস্থিরভাবটা দূর হলে পরবর্তীতে আপনি নিজেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন। আপনার মনোযোগ বাড়বে, ছোট ছোট বিষয়ে আনন্দ খুঁজে পাবেন এবং নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসবে। এর মূল উদ্দেশ্য প্রযুক্তিকে জীবন থেকে বাদ দেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে একটি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক তৈরি করা। প্রযুক্তি কখনই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত হয়, বরং মানুষেরই উচিত প্রযুক্তিকে নিজের সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহার করা।

তথ্যসূত্র

১) What to know about a dopamine detox

২) The real guide to dopamine detox: pros, cons, and practical ways to try it

৩) Guide to Dopamine Detox

This post was viewed: 24

আরো পড়ুন