বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৯৪৯ সালের ২১ অক্টোবর ইসরায়েলের তেল আবিব শহরে জন্মগ্রহণ করলেও বেড়ে ওঠেন জেরুজালেমে। তবে তাঁর কৈশোরের বেশিরভাগ সময় কেটেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া অঞ্চলে, যেখানে তার পিতা, খ্যাতনামা ইহুদি ইতিহাসবিদ বেঞ্জিয়ন নেতানিয়াহু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। ১৯৬৭ সালে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে নেতানিয়াহু ভর্তি হন ‘সায়েরেত মাতকাল’ নামের এক বিশেষ অভিযানের ইউনিটে। ১৯৭২ সালে তিনি অংশ নেন অপারেশন আইসোটোপে, যেখানে তেল আবিব বিমানবন্দরে ছিনতাই হওয়া সাবেনা বিমানের যাত্রীদের উদ্ধার করা হয়। এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন এহুদ বারাক।
শিক্ষা ও কূটনৈতিক জীবন
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে নেতানিয়াহু ফিরে যান আমেরিকায়। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচার ও ব্যবসা প্রশাসনে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর তিনি বোস্টন কনসালটিং গ্রুপে চাকরি নেন। কিন্তু ১৯৭৬ সালে বড় ভাই ইয়োনি নেতানিয়াহু উগান্ডায় একটি অভিযানে নিহত হলে দেশে ফিরে আসেন তিনি।
পারিবারিক এই শোক নেতানিয়াহুকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় করে তোলে। এখান থেকেই ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। তিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরায়েলি দূতাবাসে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেন। জাতিসংঘে থাকাকালীন তিনি নাৎসি যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত গোপন নথিপত্র প্রকাশের পক্ষে সফল প্রচার চালান।
রাজনৈতিক উত্থান ও প্রথম মেয়াদ
১৯৮৮ সালে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের পার্লামেন্টে ডানপন্থি লিকুদ দলের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৯৩ সালে তিনি লিকুদের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচনে শিমন পেরেজকে পরাজিত করে দেশের নেতৃত্বে আসেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি হেবরন ও ওয়াই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়। একইসঙ্গে তিনি রাষ্ট্রীয় খাতে বেসরকারীকরণ, মুদ্রানীতির উদারীকরণ এবং বাজেট ঘাটতি হ্রাসের দিকে মনোযোগ দেন। ১৯৯৯ সালে নির্বাচনে এহুদ বারাকের কাছে পরাজিত হয়ে তিনি রাজনীতি থেকে সাময়িক বিরতিতে যান এবং বেসরকারি খাতে কাজ শুরু করেন।
দ্বিতীয়বার সরকার গঠন ও শান্তি প্রস্তাব
২০০৯ সালের ৩১ মার্চ নেতানিয়াহু দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ঐক্য সরকার গঠন করে তিনি ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে নিরস্ত্রীকৃত ও ইসরায়েলকে ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শান্তিচুক্তির পক্ষে অবস্থান নেন।
ইরান ইস্যু ও আমেরিকার সঙ্গে টানাপোড়েন
২০১৩ সালে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তি নিয়ে নেতানিয়াহুর কড়া আপত্তি ছিল। ২০১৪ সালে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ওই বছরে সরকারবিরোধী মন্তব্যের কারণে নেতানিয়াহু দুইজন মন্ত্রীকে বরখাস্ত করে, সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
২০১৫ নির্বাচন ও বিতর্ক
২০১৫ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহু আবারো বিজয়ী হন এবং তার দল লিকুদ সংসদে ৩০টি আসন পায়। তবে নির্বাচনী প্রচারে তিনি আরববিরোধী মন্তব্য করে সমালোচনার জন্ম দেন। পরে তিনি এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তিনি এখনও দ্বি-রাষ্ট্র নীতির পক্ষে আছেন।
জেরুজালেম ও পশ্চিম তীর সংক্রান্ত অবস্থান
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। নেতানিয়াহু এই সিদ্ধান্তকে “সাহসী ও ন্যায়সঙ্গত” বলে আখ্যায়িত করেন।
পরে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট এমন একটি আইন পাস করে, যেটাতে উল্লেখ করা হয় ভবিষ্যৎ শান্তিচুক্তিতে জেরুজালেমের অংশ হস্তান্তর করতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি, পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণ এবং সেগুলোকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য লিকুদ দলের কেন্দ্রীয় কমিটি একটি প্রস্তাব পাশ করে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তদন্ত ও প্রতিবাদ
২০১৭ সালের আগস্টে জানা যায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুটি দুর্নীতির মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে তদন্ত চলছে। ইসরায়েলি রাজনীতিতে তখন এক নাটকীয় মোড় আসে। অভিযোগ ছিল, প্রভাবশালী দুই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিনি উপহার গ্রহণ করেছেন এবং একটি সংবাদমাধ্যমকে নিজের পক্ষে ইতিবাচক প্রতিবেদন ছাপাতে চাপ দিয়েছেন। এই ঘটনার পর, নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি “সুপারিশ বিল” নামে এক বিতর্কিত আইন প্রস্তাব করে। এই বিল অনুসারে, তদন্ত চলাকালে পুলিশের কোনো সুপারিশ বা বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না। সমালোচকেরা আখ্যা দেন, নেতানিয়াহু নিজেকে আইনি বিপদ থেকে বাঁচানোর নির্লজ্জ চেষ্টা করছেন।
২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর, এই বিলের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হয় তেল আভিভে। প্রায় ২০,০০০ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নেতানিয়াহু জানান, তিনি দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিলের ভাষা পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তা ব্যক্তিগত তদন্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।
২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি পুলিশ ঘোষণা করে, নেতানিয়াহুকে ঘুষ, প্রতারণা ও আস্থাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত করার জন্য তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। যদিও নেতানিয়াহু টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে এই অভিযোগকে গুরুত্ব দেননি।
২০১৯ ও ২০২০ সালের নির্বাচন
২০১৯ সালের এপ্রিলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হন সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজ, যিনি “ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট” নামে একটি মধ্যপন্থি জোট গঠন করেন। নির্বাচনে গান্টজ পরাজিত হলেও নেতানিয়াহু সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট গঠনে ব্যর্থ হন। ফলে ইসরায়েলি নেসেট (পার্লামেন্ট) নিজেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। এতে ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পায় ৩৩টি আসন আর লিকুদ ৩২টি। প্রথমে রাষ্ট্রপতি রেউভেন রিভলিন নেতানিয়াহুকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। কিন্তু তিনিও ব্যর্থ হন, এরপর দায়িত্ব দেওয়া হয় গান্টজকে। কিন্তু তিনিও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারায়, তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
২০১৯ সালের শেষ দিকে গিদেওন সা’আরকে পরাজিত করে নেতানিয়াহু পুনরায় দলের নেতৃত্বে আসেন। ২০২০ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে লিকুদ আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। গান্টজ সংসদ সদস্যদের সমর্থন পেলেও করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হয়।
অভিযোগপত্র দাখিল
২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল আনুষ্ঠানিকভাবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা ও আস্থাভঙ্গের অভিযোগ ঘোষণা করেন। নেতানিয়াহু এটিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেন। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তিনি পার্লামেন্টে দায়মুক্তির আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়।
ব্যক্তিগত জীবন
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্ট। ইয়ার এবং অ্যাভনার নামে তাদের দুটি পুত্রসন্তান রয়েছে। আগের এক বিবাহ থেকে তার নোয়া নামে এক কন্যাসন্তান আছে।
নেতানিয়াহু সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে একাধিক গ্রন্থ লিখার পাশাপাশি সম্পাদনাতেও হাত লাগিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো:
- Self-Portrait of a Hero: The Letters of Jonathan Netanyahu (1963–76)
- International Terrorism: Challenge and Response (1979)
- Terrorism: How the West Can Win (1987)
- A Place Among the Nations: Israel and the World (1992)
- Fighting Terrorism: How Democracies Can Defeat Domestic and International Terrorism (1996)
এই লেখাগুলোর মাধ্যমে তিনি ইসরায়েলের ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
অতীতে নানা নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে তাঁর নেতৃত্ব ঘিরে বিতর্ক, সমর্থন ও সমালোচনার ধারা এখনও চলমান। আগামী দিনে তাঁর সিদ্ধান্ত ইসরায়েল তথা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ প্রভাবিত করবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র
- Benjamin Netanyahu | Biography, Education, Party …
- Benjamin Netanyahu: Prime Minister of Israel, Background …
- Benjamin Netanyahu, Israel’s controversial leader
- Binyamin (Bibi) Netanyahu – Biography – Gov.il
- The Churchill of the Middle East