৪৭৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সংঘটিত প্লাতেয়ার (Battle of Plataea) সংঘর্ষ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক লড়াই। বহু বছর ধরে পারস্যকেন্দ্রিক একিমিনিড সাম্রাজ্য আর গ্রীসের মধ্যে চলমান যুদ্ধের ইতি ঘটে প্লাতেয়াতে। সম্মিলিত গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলো ইউরোপে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, পারসিকদের রাজ্যবিস্তার প্রাচ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে।
পটভূমি
পারস্যের প্রতাপশালী সম্রাট প্রথম দারিয়ুস (Darius I) এথেন্সের প্রতি বিরূপ ছিলেন। সেই সূত্রে গ্রীসের মূল ভূখণ্ড করায়ত্ব করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। ৪৯০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বিশাল একিমিনিড সেনাদল আক্রমণও চালিয়েছিল, কিন্তু ম্যারাথনের ময়দানে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করে এথেন্স। পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার সংকল্প করেছিলেন দারিয়ুস, কিন্তু মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয় তাঁকে।
তবে দারিয়ুসের প্রতিশোধস্পৃহা সংক্রমিত হয়েছিল রাজপুত্রের মধ্যে। সিংহাসনে বসে জার্ক্সেস (Xerxes I) প্রাথমিকভাবে ক্ষমতা সুসংহত করায় মনোযোগী হন, তবে গ্রীসের কথা ভুলে যাননি তিনি। মারাথনের দশ বছরের মাথায় সমবেত হয় লাখ লোকের বিশাল সেনাদল। পারস্যের অধীনস্থ সমস্ত রাজ্য সরবরাহ করেছিলে সৈনিক, আর অন্তর্ভুক্ত ছিল ভারতীয়রাও।
গ্রীসে লড়াই
এথেন্স আর স্পার্টা একজোট হলো, উত্তর গ্রীসের কিছু রাজ্য আবার হাত মেলালো জার্ক্সেসের সঙ্গে। তাঁর সেনাদের একদল নৌবহরে চেপে এথেন্স বরাবর রওনা দিল, বাকিদের নিয়ে সম্রাট নিজে স্থলপথে অগ্রসর হন।
থার্মোপাইলির গিরিপিথে প্রথম বাধা আসে। সম্মিলিত গ্রীক বাহিনীর প্রবল বাধার মুখে পড়ে পারসিকরা। এক পর্যায়ে এক বিশ্বাসঘাতক পাহাড়ের ওপর দিয়ে ঘুরপথে গ্রীকদের পেছনে নিয়ে যায় জার্ক্সেসের লোকদের। পরাজয় অবশ্যম্ভাবী বুঝে স্পার্তার রাজা লিওনিদাস ৩০০ জন সেনা রেখে বাকিদের পিছিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই ৩০০ সেনার মধ্যে স্পার্তা ছাড়াও থিবস আর থেস্পিয়ার সৈন্য ছিল।
থার্মোপাইলিতে লিওনিদাসকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে পিলপিল করে এথেন্সে দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন জার্ক্সেস। বোয়েশিয়াতে তাণ্ডব চালায় তাঁর সেনারা, মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় প্লাতেয়া আর থেস্পিয়া। এরপর তাদের নিশানায় ছিল এথেন্স। শত্রুদের আসার খবর পেয়ে ততোদিনে এথেন্সবাসী নগর ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিল। ফলে ফাঁকা শহরে আগুন লাগিয়েই খুশি থাকতে হয় সম্রাটকে।
ওদিকে সালামিসের প্রণালীতে মুখোমুখি হয় এথেন্স আর পারস্যের নৌবহর। সংকীর্ণ নৌপথে বিশাল পারসিক জাহাজ বেকায়দায় পড়ে যায়, তুলনামূলকভাবে ছোট এবং ক্ষিপ্র গ্রীক জাহাজ নাজেহাল করে ছাড়ে তাদের। এখানে পারস্যের নৌবহর প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।
জার্ক্সেসের উপদেষ্টারা সম্রাটকে গ্রীসের দায়িত্ব বিশ্বস্ত একজন জেনারেলের হাতে দিয়ে ফিরে যাবার পরামর্শ দেন। সিংহভাগ সেনাদল নিয়ে সম্রাট ফিরে যান রাজধানীতে, উত্তর গ্রীসে রেখে যান জেনারেল মার্দোনিয়াসকে। তিনি বার্তা পাঠিয়ে এথেন্সকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।
এথেন্সের সাথে মেগারা আর প্লাতেয়ার লোকেরাও তখন একজোট হয়েছে। তারা স্পার্তাকে জানিয়ে দিলো দ্রুত অতিরিক্ত সেনা নিয়ে তারা যোগ না দিলে মার্দোনিয়াসের শর্ত না মেনে উপায় থাকবে না। স্পার্তানরা সেনা সমাবেশ আরম্ভ করল।
প্লাতেয়ার প্রান্তরে
মার্দোনিয়াসের চরেরা স্পার্তানদের যাত্রা করার খবর পৌঁছে দিলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন পারসিক জেনারেল। থিবস তখন জার্ক্সেসের বশ্যতা স্বীকার করেছে। তাদের অঞ্চলে প্রবেশ করলেন তিনি, সেখানে উন্মুক্ত সমতলভূমি মার্দোনিয়াসের অশ্বারোহীদের জন্য সুবিধাজনক। এরপর প্লাতেয়ার অনতিদূরে শিবির ফেলেন তিনি। সময় তখন ৪৭৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের জুলাই।
মার্দোনিয়াসের হাতে প্রায় ৭০০০০ সৈন্য। মূল শক্তি অশ্বারোহী, আর এলিট ইউনিট ইম্মোর্টালস (Immortals)। সাধারণ সৈনিকরা এসেছে বিস্তীর্ণ পারস্য সাম্রাজ্যের নানা প্রদেশ থেকে। বছরের পর বছর যুদ্ধ করতে করতে এরা পোড়খাওয়া। তবে টানা লড়াইয়ের ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে তাদের।
গ্রীক জোট মার্দোনিয়াসের থেকে কিছুটা দূরে এক পাহাড়ের ওপর ছাউনি ফেলে। সব মিলিয়ে ৩০০০০-৪০০০০ লোক তাদের। এর এক-তৃতীয়াংশ স্পার্তান, এথেন্স দিয়েছে ৮০০০ সেনা, কোরিন্থ থেকে এসেছে ৫০০০ লোক। মেগারাসহ বাকি নগররাষ্ট্রগুলোর পূরণ করেছে বাকিটা। সংখ্যার ভারে পারসিকদের থেকে বেশ পিছিয়ে তারা।
পারসিকরা যেখানে অশ্বারোহীদের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে গ্রীকদের মূল শক্তি ভারী অস্ত্রসজ্জিত পদাতিক, বা হপলাইট (hoplite)। খুব ঘন হয়ে কয়েকটি দল বা ফ্যালাংক্সে বিন্যস্ত হয় হপলাইটরা। অধিনায়ক ছিলেন স্পার্তান জেনারেল পসেনিয়াস (Pausanias)।
সংঘর্ষ
দুই দলকে আলাদা করে রেখেছিল এসোপাস নদী (Asopus)। প্রায় এক সপ্তাহ কেউই যুদ্ধ করার আগ্রহ দেখায়নি, ছোটখাট খোঁচাখুঁচির মধ্যেই সীমিত ছিল সংঘাত। তবে মার্দোনিয়াসের অশ্বারোহীরা গ্রীকদের সরবরাহ পথের ওপর সফলভাবে বেশ কিছু হামলা চালায়। একপর্যায়ে গ্রীকদের দক্ষিণদিকে এক ঝর্ণার (Gargaphian Spring) দখল নিয়ে নেয় তারা। গ্রীকদের পানির একমাত্র উৎস ছিল এই ঝর্ণা, ফলে হুমকির মুখে পড়ে যায় তাদের অবস্থান।
পরিস্থিতি সামলাতে পসেনিয়াস ঠিক করলেন আপাতত প্লাতেয়ার দিকে পিছিয়ে যাবেন, নতুন করে রসদপত্র জোগাড় করে চেপে ধরবেন শত্রুদের। মার্দোনিয়াস যাতে কিছু টের না পান সেজন্য রাতের অন্ধকারে শিবির উঠিয়ে সরে যেতে থাকে গ্রীকরা। কিন্তু অন্ধকারে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে তারা। বিচ্ছিন্ন হয়ে এথেন্সবাসীরা বামবাহু, স্পার্তানরা ডান আর বাকিরা মাঝে পড়ে যায়।
ভোরের আলোতে গ্রীকদের ব্যুহের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে পারসিকদের কাছে। এই সুযোগ হেলায় হারানো ঠিক হবে না ভেবে মার্দোনিয়াস বাহিনীকে আগে বাড়তে নির্দেশ দেন। তাঁর অশ্বারোহীরা তীব্র বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রীকদের ওপর। তাদের তীর আর বর্শার আঘাত সয়ে জায়গা ধরে রাখে হপলাইটরা। বিশেষ করে দুই বাহুতে লড়াই ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
একপর্যায়ে স্পার্তার সেনারা পারস্যের অশ্বারোহীদের হটিয়ে দিয়ে সরাসরি তাদের পদাতিকদের ওপর হামলা করে। এই আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয় মার্দোনিয়াসের লোকেরা। পারসিক জেনারেল নিহত হন, সম্ভবত অ্যারিমনেস্টোস (Arimnestos) নামে এক স্পার্তানের হাতে।
নেতার পতনের ফলে দুর্বল হয়ে যায় জার্ক্সেসের লোকদের মনোবল, ভেঙে পড়ে তাদের প্রতিরোধ। গ্রীকরা তাদের ধাওয়া করে পারস্য শিবিরে প্রবেশ করে ছারখার করে দেয় সব। বলা হয় ৩০০০০ এর বেশি শত্রুসেনাকে হত্যা করেছিল গ্রীকরা, তাদের নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি ছিল অনেক কম। অবশিষ্ট পারসিকরা কোনোমতে জান বাঁচায়।
ফলাফল
মার্দোনিয়াসের মৃত্যুর সাথে সাথেই পারস্যের হুমকি সমাপ্ত হয়। জার্ক্সেস আর গ্রীসে ফিরে আসেননি। তাঁর নৌবহরের যে অংশ অবশিষ্ট ছিল সেটাও প্লাতেয়ার পরদিন মাইকালির নৌযুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যায়।
এই যুদ্ধের বহিঃশত্রু ঠেকাতে এথেন্স আর স্পার্তার নেতৃত্বে গ্রীকদের জোট গঠিত হয়। যদিও বেশিদিন টেকেনি সেটা। তবে এটা অনস্বীকার্য যে পারস্যের সামরিক শক্তি কমে যাওয়ার পেছনে প্লাতেয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই বিজয়ে উদ্দিপ্ত হয়ে পারস্যের অধীনস্থ অনেক গ্রীক এলাকা বিদ্রোহ করে বসে। একপর্যায়ে মূল ভূখণ্ডে নগররাষ্ট্রগুলো এশিয়া মাইনর অবধি অগ্রসর হয়।
References
- Battle of Plataea: Encyclopedia Britannica.
- “The Histories.” (Translation by Aubrey de Sélincourt), Penguin Classics, 1954.
- Holland, Tom. “Persian Fire: The First World Empire and the Battle for the West.” Abacus, 2006.
- Lazenby, J.F. “The Defence of Greece 490–479 BC.” Aris & Phillips, 1993.
- Green, Peter. “The Greco-Persian Wars.” University of California Press, 1996.