Ridge Bangla

তালাস নদীর লড়াই: ইসলামি খেলাফত যখন মুখোমুখি সুবিশাল চীনের

ইসলামি খেলাফত যুগে যুগে অনেক প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য আর আফ্রিকাতে খেলাফত সম্প্রসারণের সময় তৎকালীন পরাশক্তিদের সাথে টক্করের ঘটনা তো সুবিদিত। তবে এসবের মাঝে খানিকটা আড়ালে পড়ে গেছে এশিয়ার অন্যতম শক্তি, চীনের সাথে সংঘাত। তালাস নদীর যুদ্ধ ছিল (Battle of Talas) মধ্য এশিয়াতে দুই শক্তির সীমানা নির্ধারণী লড়াই। এর ফলে এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অংশের সাথে অমুসলিম প্রধান অংশের সুস্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়।

টাং সাম্রাজ্য

সপ্তম থেকে দশম শতকের সূচনাকাল পর্যন্ত চীনের মসনদে ছিল টাং (Tang) রাজবংশ। সামরিক শক্তি প্রয়োগের থেকে বাণিজ্য আর নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে সাম্রাজ্য সুসংহত করার প্রতি মনোযোগী ছিল তারা। এই সময় তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় প্রতিবেশী তিব্বত। সেখানে সঙ্গতসান গাম্পোর (Songtsan Gampo) হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শক্তিশালী এক রাজ্য।

বর্তমান চীনের জিনজিয়াং (Xinjiang) আর পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে টাং আর সঙ্গতসানদের মধ্যে চলছিল কাড়াকাড়ির খেলা। একবার এই দল এলাকা দখল করে, কিছুদিন পরেই অন্যদল সেটা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তিব্বতিরা বাদেও উত্তরে উইঘুর এবং তুরফান (Turfans) জাতি, এবং দক্ষিণে লাও/থাই গোত্রের (Lao/Thai) উৎপাতে ব্যতিব্যস্ত ছিল টাংরা।

রেশম পথ বা সিল্ক রোডের নিরাপত্তা নিয়েও উৎকণ্ঠিত ছিল টাংরা। মূল্যবান মালামাল নিয়ে এই পথে ভ্রমণ করতো সওদাগররা। তাদের নির্বিঘ্ন বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করতো রাজস্বের একাংশ। এজন্য প্রাচ্যের নানা শক্তির সাথে জোটও করেছিল তারা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পার্থিয়া এবং তার উত্তরসূরি পারস্যের সাসানিদ সাম্রাজ্য। রেশম পথের জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগেও দ্বিধা করতো না চীন। হান জেনারেল বান চাও (Ban Chao) তো একবার দুর্বৃত্তদের শায়েস্তা করতে ৭০,০০০ সেনা নিয়ে বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের মার্ভ শহর পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন।

ইসলামি শক্তির উত্থান

টাংরা যখন এশিয়াতে প্রভাব বিস্তার করছে তখন চলছে ইতিহাসে এক পালাবদলের খেলা। এর সূচনা আরবের মরুভূমিতে। ইসলামের পতাকা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে গড়ে উঠেছে সুদূরপ্রসারী এক সাম্রাজ্য। খোলাফায়ে রাশেদিনের পর এর হাল ধরেছে উমাইয়ারা। মধ্য এশিয়াতে মুসলিমদের আনাগোনা তখন থেকেই শুরু।

৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে সাসানিদের তখনকার রাজধানী মার্ভ দখল করে উমাইয়া সেনারা, নিহত হন সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগার্দ (Yazdegerd III)। মার্ভকে কেন্দ্র করে এরপর পতন ঘটে বুখারা থেকে শুরু করে চীন/কিরগিজস্তানের সীমান্তবর্তী কাশগড়ের।

মধ্যে এশিয়াতে মিত্রও খুঁজে পায় উমাইয়ারা। অষ্টম শতকে তিব্বতিরা তাদের সাথে হাত মিলিয়ে ফর্গনা উপত্যকার (বর্তমান উজবেকিস্তান, তাজাকিস্তান আর কিরগিজস্তানের অংশ) রাজাকে সরিয়ে বশংবদ এক ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসায়। রাজা সাহায্য চাইতে যান চীনের কাছে। দশ হাজার সেনার এক বাহিনী এসে তাকে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়।

এর বছর দুই পর উমাইয়া আর তিব্বতিরা জিনজিয়াংয়ের দুটো শহর অবরোধ করে। টাংরা নিজেদের বাহিনী না পাঠিয়ে ভাড়া করে তুর্কি কারলুক (Qarluq) যোদ্ধাদের। তাদের আক্রমণে বিপর্যস্ত উমাইয়ারা পিছিয়ে যায়।

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে পতন হয় উমাইয়াদের, খেলাফত চলে যায় আব্বাসি বংশের কাছে। সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে সীমানা সংহত করাকে গুরুত্ব দেয় তারা। এর অন্যতম ছিল ফর্গনা উপত্যকা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করা। রেশম পথের কৌশলগত অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়াও আব্বাসিদের উদ্দেশ্য ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চীনের সাথে সংঘাতের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

সূত্রপাত

মধ্য এশিয়াতে তিব্বতিদের পাশাপাশি উইঘুরদের সাথেও মিত্রতা করে আব্বাসিরা। সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল জিয়াদ ইবনে সালিহ (Ziyad ibn Salih)। সুদক্ষ যোদ্ধা এবং বিচক্ষণ রণকৌশলের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি। তার প্রতিপক্ষ গভর্নর জেনারেল কাও (Kao Hsien-chih/Go Seong-ji)। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি জাতে কোরিয়ান, চৈনিক নন। তখনকার চীনে এমন ঘটনা ছিল খুব স্বাভাবিক।

দুই পরাশক্তির ঝামেলার মূলে ছিল আঞ্চলিক মিত্রদের মন কষাকষি। ফর্গনা উপত্যকা আর পার্শ্ববর্তী শাশ (Shash) পরস্পরের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। ফর্গনার রাজা চীন, আর শাশ আব্বাসিপন্থী।

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে টাং সম্রাট জুয়াংজংকে (Xuanzong) মন্ত্রণা দিলেন ফর্গনার রাজা, শাশ ছিনিয়ে নিয়ে তার হাওলা করে দেয়া হোক। ডাক পড়ল জেনারেল কাওয়ের। রাজধানী অবরোধ করে কাও প্রস্তাব দিলেন সিংহাসন ছেড়ে দিলে নিরাপদে রাজাকে চলে যেতে দেবেন। কিন্তু শহর মুঠোয় চলে আসা মাত্র ভোল পাল্টে ফেললেন তিনি, আদেশ দিলেন রাজার শিরশ্ছেদের।

শাশের যুবরাজ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। খোরাসানের আব্বাসি গভর্নর আবু মুসলিমের (Abu Muslim) দরবারে হাজির হয়ে সহায়তা প্রার্থনা করলেন তিনি। মুসলিম শাসক পাঠালেন জিয়াদ ইবনে সালিহকে, সঙ্গী হলেন বোখারার গভর্নরও। খোরাসানের পাশাপাশি তৎকালীন তোখারিস্তান এবং ট্রান্সঅক্সানিয়া থেকেও সৈনিক সংগ্রহ করা হয়।

কাও অবশ্য একা নন, তার সাথে যোগ দেয় ফর্গনার বাহিনীও। পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে নাকি দলে টেনেছিলেন কুরলুকদেরও। সৈন্যসংখ্যা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আছে। কোনো কোনো সূত্রমতে দুই বাহিনীই নাকি ছিল লাখখানেক লোকের। দুই পক্ষের নথিপত্রে আছে বিপরীতমুখী দাবি। আব্বাসিদের বক্তব্য কাওয়ের সঙ্গে নাকি কম করে হলেও এক লাখ সৈন্য। আর চাইনিজ নথিপত্রে দাবি করা হয়- মুসলমানদের সংখ্যা কম করে হলেও দুই লাখ। আধুনিক গবেষকদের ধারণা, সব মিলিয়ে কারোরই ৫০,০০০ এর বেশি লোক ছিল না।

যুদ্ধ

৭৫১ সালের জুলাই মাস। বর্তমান কিরগিজস্তান ও কাজাখস্তানের সীমান্তবর্তী তালাস নদীর তীরে দুই পক্ষ শক্তিপরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। সত্যিকার যুদ্ধ নিয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা খুব কমই পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি নিয়ে দুই ধরনের মতামত আছে।

টাংদের রেকর্ডে বলা হয়- প্রায় পাঁচ দিন ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলে। প্রথম তিন দিন মুখ্য ভূমিকায় ছিল তীরন্দাজ আর পদাতিক সেনারা। কাওয়ের বাহিনীর সিংহভাগই এই দলে, অন্যদিকে আব্বাসিদের অর্ধেক অশ্বারোহী।

চতুর্থ দিনে টাকার বিনিময়ে কুরলুকরা বিশ্বাসঘাতকতা করে পেছন থেকে আক্রমণ করে। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বশক্তিতে হামলা চালায় আব্বাসিরা। কাওয়ের ভাগ্য এরপরেই নির্ধারিত হয়ে যায়। বহু হতাহত ফেলে প্রাণ হাতে নিয়ে পালালেন টাংদের জেনারেল।

তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক আব্বাসিদের বিবরণ অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করেন। এই মত অনুযায়ী, প্রথম থেকেই কুরলুকরা আব্বাসিদের হয়ে যুদ্ধ করছিল। চারদিন যুদ্ধ চলার পর পঞ্চম দিন সকালে জেনারেল জিয়াদের পরিকল্পনা অনুযায়ী দু’দিক থেকে চাইনিজদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। প্রবল আক্রমণে কাবু হয়ে যান কাও।

তবে দুই গল্পই কাওয়ের শোচনীয় পরাজয়ের কথা স্বীকার করে। নিজে পালাতে পারলেও অন্তত ৩০,০০০ সেনা নাকি হারান তিনি তালাসের ধারে। বহু টাং যোদ্ধাকে বন্দী করে সমরকন্দে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিণতি

তালাসের পর সাময়িকভাবে মধ্য এশিয়ার চীনের প্রভাব ভেঙে পড়ে। আব্বাসি সেনাবাহিনীর সামনে এই সময় উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিলে চীনের মূল ভূখণ্ড। কিন্তু তারাও এসে পৌঁছেছিল নিজেদের সামর্থ্যের শেষ সীমায়। তাদের সবথেকে নিরাপদ ঘাঁটিও ছিল তালাস থেকে বহু দূরে, ফলে শত্রু এলাকায় বিপদে পড়লে জানমাল সামলে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়বে। রসদপত্রের সরবরাহও ছিল কঠিন। তদুপরি পশ্চিম চীনের মরুভূমি সামরিক অভিযানের জন্য খুব উপযুক্তও নয়। ফলে পরাজিত হলেও কৌশলগত দিক থেকে তালাস আসলে অমীমাংসিত।

তালাস ছিল আব্বাসি খেলাফতের পশ্চিমের দূরতম সীমান্ত। দুই পক্ষের কেউই দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ে ইচ্ছুক ছিল না। তবে মধ্য এশিয়ায় নিজেদের ক্ষমতা ফিরে পেতে আগ্রহী ছিল টাংরা, এজন্য চার বছরের মাথায় নতুন করে সেনা সমাবেশও করে তারা। কিন্তু সেই সময় সাম্রাজ্যে বিদ্রোহ দেখা দিলে টাং সম্রাট বেকায়দায় পড়ে যান। বিদ্রোহ দমন করতে রাজধানীতে ফিরিয়ে আনেন সেনাদল। এই যাত্রায় টিকে গেলেও দুর্বল হয়ে পড়ে সাম্রাজ্য, ফলে তাদের দিক থেকে আব্বাসি খেলাফতের প্রতি হুমকি হ্রাস পায়।

নিউ ইয়র্ক সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক পার্কের (Hyunhee Park) মতে, তালাস ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। এর ফলে মধ্য এশিয়ায় চীন খর্বশক্তি হয়ে পড়ে, বৃদ্ধি পায় আব্বাসিদের প্রতিপত্তি। এর ছাপ পড়ে এশিয়ার রেশম পথেও, যেখান থেকে প্রচুর মুনাফা অর্জন করে ইসলামি খেলাফত। ধর্ম হিসেবেও এই অঞ্চলে প্রসার ঘটে ইসলামের।

References

This post was viewed: 26

আরো পড়ুন