Ridge Bangla

ইন্টার মিলানের পুনরুত্থানের গল্প

একজন ফুটবলভক্ত হিসেবে আপনি যেরকম ম্যাচ প্রত্যাশা করেন, এবারের চ্যাম্পিয়ন্স লীগে সেমিফাইনালে বার্সেলোনা বনাম ইন্টার মিলান ম্যাচ দুটি ছিল ঠিক সেরকম দুটি ম্যাচ। দুই লেগ মিলিয়ে মোট তেরবার বল জালে জড়ানো, অতিরিক্ত সময়ে গোলের মাধ্যমে ম্যাচ বাঁচিয়ে রাখা, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ– কী ছিল না এই ম্যাচ দুটিতে?

দ্বিতীয় লেগে ইতালির ঐতিহাসিক সান সিরো স্টেডিয়ামে যখন বার্সেলোনা ফাইনালে যাওয়ার অন্তিম প্রহর গুণছে, ঠিক সেসময়েই ফ্রাঙ্কো এসার্বির গোলে ম্যাচে দারুণভাবে ফিরে আসে ইন্টার মিলান। এরপর কোনরকম ভুল না করে অতিরিক্ত সময়ে ডেভিড ফ্রাত্তেসির গোলে তুমুল উত্তেজনাময় ম্যাচটি নিজেদের করে নেয় ইন্টার মিলান। এই মৌসুম ধরলে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের শেষ তিনটি আসরের দুটিতে ফাইনাল নিশ্চিত করেছে মিলান শহরের ঐতিহ্যবাহী এই দলটি।

মাঝে একটা লম্বা সময় ধরে ইন্টার মিলান বেশ খারাপ সময় অতিবাহিত করেছে। ইউরোপ তো বটেই, খোদ ইতালীয় ফুটবলেই সুবিধা করতে পারছিল না নেরাজ্জুরিরা। যে ক্লাবে একসময় হাভিয়ের জানেত্তি, দিয়েগো মিলিগো, লোথার ম্যাথাউস, রোনালদো লিমাদের মতো বৈশ্বিক তারকারা খেলে গিয়েছেন, সেই ক্লাবের এমন দুঃসময় বেশ অকল্পনীয় ছিল৷ কিন্তু ভাগ্যের লিখনকে খন্ডানোর উপায় নেই।

ইতালীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে প্রায় এক দশক ধরে জুভেন্টাসের চূড়ান্ত আধিপত্যের পর অবশেষে সাবেক কোচ এন্টোনিও কন্তের হাত ধরে স্কুদেত্তো জিতে নেয় ইন্টার মিলান৷ এর মাধ্যমে ইতালির ফুটবলে জুভেন্টাসের একাধিপত্যের অবসান ঘটে, অপরদিকে ইন্টার মিলান তার পুনরুত্থানের বার্তা দেয়। মজার ব্যাপার হলো, যে জুভেন্টাস ইন্টার মিলানের আধিপত্য খর্ব করে সেরি আ’তে নিজেদের মনোপলি প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই ইন্টার মিলানই আবার জুভেন্টাসের এক দশক ধরে চলা মনোপলির পথে মূল বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়।

২০২১ সালের এন্টোনিও কন্তে ইন্টার মিলানকে স্কুদেত্তো জিতিয়েই কন্তে ক্লাব ছেড়ে প্রিমিয়ার লীগে পাড়ি জমান। কারণ ইন্টার মিলানের বোর্ড স্কোয়াডের পিছনে কোচের ইচ্ছা অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করতে ইচ্ছুক ছিল না। কোচ কন্তের বিদায়ের পরপরই বিদায় নেয় মার্সেলো ব্রোজোভিচ, আশরাফ হাকিমি, মিলান স্ক্রিনিয়ার ও রোমেলু লুকাকুর মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়েরা।

এন্টোনিও কন্তের পর ক্লাবটির হাল ধরেন সিমন ইনজাঘি, যিনি এর আগে খেলোয়াড় হিসেবে দীর্ঘসময় ক্লাব সময় অতিবাহিত করেছেন। তাকে দায়িত্ব দেয়ার পিছনে ইন্টার মিলান বোর্ডের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তিনি খুব অল্প বাজেটেই বা তূলনামূলক অখ্যাত খেলোয়াড়দের নিয়েই ট্রফির জন্য ভালো লড়াই করতে পারেন। ইন্টার মিলান বোর্ডের দর্শন ছিল এরকম একজনকেই খুঁজে বের করা। ভাগ্যক্রমে ইতালীয় শীর্ষ স্তরের আরেক ক্লাব লাৎসিওতে দীর্ঘ সময় পার করার পর সিমন ইনজাঘি’ও ইন্টারের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান।

এন্টোনিও কন্তের পর সিমন ইনজাঘি যখন দায়িত্ব নিলেন তখন দলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু খেলোয়াড়ের বিদায়ে সদ্য স্কুদেত্তো জেতা দলটির শক্তিক্ষয় হয়েছে অনেকখানি। পরীক্ষিত গোলস্কোরার রোমেলু লুকাকু নেই, ফুলব্যাক আশরাফ হাকিমি ক্লাব ছেড়েছেন প্যারিসের উদ্দেশ্যে। মিডফিল্ডে মার্সেলো ব্রোজোভিচকেও দেখা যাবে না আর। এখান থেকে দলটিকে আবার শিরোপার লড়াইয়ে টেনে তোলার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। এছাড়া অনেক ক্লাবের মতো তার হাতে পর্যাপ্ত অর্থও নেই, যাতে করে তার ট্যাকটিক্স বাস্তবায়নের মতো মতো বাঘা বাঘা খেলোয়াড় নিয়ে আসতে পারবেন তিনি। তাই তিনি তার পুরনো কৌশলের দ্বারস্থ হলেন আবার।

সাবেক ক্লাব লাৎসিওতে থাকতে সিমন ইনজাঘি অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করেছিলেন। সব কোচ যেখানে তরুণদের উপর ভরসা রাখতে ভালোবাসেন, সেখানে ইনজাঘি স্রোতের বিপরীতে গিয়ে অভিজ্ঞদের উপরেই বাজি ধরতেন। সাধারণত ত্রিশ বছর বা তার বেশি হলেই ক্লাবগুলো তাদের খেলোয়াড়দের বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু লাৎসিওতে তার দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের অনেকেই ছিলেন ত্রিশোর্ধ্ব। ২০১৯ সালে লাৎসিওর যে দলটিকে নিয়ে তিনি কোপা ইতালিয়া জিতলেন, সেটিতে লুকাস লেইভা ছিলেন ৩২ বছর বয়সী, মার্কো পারোলো বয়স ছিল ৩৪। উইংব্যাকের মতো অবস্থানে ছিল ৩৩ বছর বয়সী সেনাদ লুলিচ। সুতরাং অভিজ্ঞদের দিয়েই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বের করে আনার পরীক্ষায় সিমন ইনজাঘি আগেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ইন্টারে এসে তিনি ওই কাজটিই আবার করলেন।

ইন্টার মিলানের কোচ হওয়ার পর দলবদলে এমন ত্রিশোর্ধ্ব অনেককেই নিয়ে আসলেন। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলান থেকে মিডফিল্ডার হাকান চালহানোগলুকে নিয়ে আসলেন। রোমা থেকে নিয়ে আসলেন আরেক ত্রিশোর্ধ্ব খেলোয়াড় হেনরিখ মিখিতারিয়ানকে। ইতালির আরেক ক্লাব বলোগনা এফসি থেকে ইনজাঘির ডাকে চলে আসলেন মার্ক আরনাউতোভিচ। তার সাবেক ক্লাবের খেলোয়াড় ফ্রাঙ্কো এসার্বিও তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে আসল ইন্টার মিলানে। বায়ার্ন মিউনিখ থেকে ডেকে নিয়ে আসা হলো ইয়ান সোমারকে। তারা যখন ইন্টার মিলানে পা রাখেন, তখন তাদের সবার বয়স ত্রিশের উপরে। তবে তরুণ খেলোয়াড় যে আসেনি, এমনটিও নয়। মার্কাস থুরাম, ডেনজেল ডামফ্রাইস, ক্রিস্টিয়ান আসলান্নি, ডেভিড ফ্রাত্তেসির মতো তরুণ খেলোয়াড়েরাও এসেছেন ক্লাবে যারা এখন ইন্টার মিলানের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।

সিমন ইনজাঘির অধীনে ইন্টার মিলান ঘুরে দাঁড়িয়েছে বেশ ভালোভাবেই। যে ইন্টার মিলান একসময় সেরি আ’তে ‘টপ ফোর’ নিশ্চিত করতেই খাবি খাচ্ছিল, তারা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে লাস্ট তিন আসরে দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনাল খেলবে এবার। গত মৌসুমে ইন্টার মিলান স্কুদেত্তো জয় করেছে, এবারও নাপোলির সাথে পাল্লা দিয়ে লড়ে যাচ্ছে। ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ টানা দুই মৌসুমে ইতালিয়ান কাপ জিতেছে। এর পাশাপাশি শেষ তিন মৌসুমের প্রতিটি ইতালিয়ান সুপার কাপ প্রতিযোগিতার শিরোপা ঘরে তুলেছে ইনজাঘির ইন্টার মিলান। এবারের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রফি জিততে পারলে ইন্টারের কিংবদন্তি কোচদের তালিকায় নিজেকে অনন্য অবস্থানে নিয়ে যাবেন তিনি।

পেট্রোডলারের এই সময়ে ক্লাবগুলো যেখানে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ছড়িয়েও সাফল্য লাভ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে সীমিত বাজেট নিয়েই তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন সিমন ইনজাঘি। তার গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের বয়স ত্রিশ পার হলেও মাঠের খেলায় সেটি বোঝার উপায় নেই। এছাড়া ইতালীয় ফুটবলের চিরাচরিত রক্ষণাত্মক কলাকৌশল থেকে বেরিয়ে এসে তিনি দৃষ্টিনন্দন আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলান। ইন্টারের দ্রুতগতির আক্রমণ দর্শকদের চোখে শান্তি বয়ে আনে। অনুশীলনে তিনি অত্যন্ত কঠোরতার সাথে খেলোয়াড়দের তার কলাকৌশল অনুযায়ী প্রস্তুত করেন। তার হাত ধরে যে ইন্টার মিলানের যে পুনরুত্থান হয়েছে, ক্লাবটির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে।

তথ্যসূত্র:

১) Inter Milan: Simone Inzaghi’s side are now part of Europe’s elite after making second Champions League final in three seasons

২) How Inter Milan Returned to the Top of Italian Football Under Simone Inzaghi

৩) Inter Milan: Simone Inzaghi’s Masterpiece

This post was viewed: 27

আরো পড়ুন