কার্লো আনচেলত্তির ডাকনাম ‘ডন কার্লো’। ডন শব্দটি আসায় বেশ বিখ্যাত একটি সিনেমার বিখ্যাত এক চরিত্রের কথা মাথায় এলো। দ্য গডফাদার সিনেমায় মারলন ব্র্যান্ডোর বলা একটি সংলাপ এমন, ‘তাকে আমি এমন প্রস্তাব দেব, যা সে ফেরাতে পারবে না!’ ব্র্যান্ডোর চরিত্রের নাম থাকে ‘ডন’ ভিটো করলিয়ন।
ভাবছেন, দুই ডনকে কেন একসঙ্গে আনা? এই সংলাপেই বা কিসের মিল? মিল আছে অনেক। কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলকে রীতিমতো জাদুই করেছেন বলা চলে। ভদ্রলোক ব্রাজিলের প্রাচীন ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ভিনদেশি কোচ। বিদেশ থেকে কোচ নিয়েছে সেলেসাওরা, তা-ও সবচেয়ে বেশি বেতনে। রেকর্ড গড়ে হলুদ শিবিরে নিজের খুঁটি গেড়েছেন আনচেলত্তি।
ভদ্রলোক হতে পারেন গেমচেঞ্জার
আনচেলত্তি ব্রাজিলের কোচ হওয়াতে নাখোশ খোদ দেশটির প্রেসিডেন্ট। লুলা দ্য সিলভা সরাসরিই বলেছিলেন, ‘আমি বিদেশিদের বিপক্ষে নই। কিন্তু আমার মনে হয়, ব্রাজিলেই অনেক মানসম্পন্ন কোচ আছেন যারা সেলেসাওদের নেতৃত্ব দিতে পারেন। আনচেলত্তি কখনও তার দেশ ইতালিকে কোচিং করায়নি।’
তার জায়গা থেকে ভুল কিছু বলেননি লুলা। ২৯ বছরের কোচিং ক্যারিয়ায়ে বহু বাঘা বাঘা ক্লাবকে কোচিং করালেও জাতীয় দলকে কোচিং করাবার অভিজ্ঞতা নেই আনচেলত্তির। অথচ, এমন একজনকে নিয়ে স্বপ্নের বীজ বুনছে ব্রাজিল সমর্থকরা। বিশ্লেষকদের মতে, ইতালিয়ান ভদ্রলোক হতে পারেন গেমচেঞ্জার। সমান্তরালে উঁকি দেয় শঙ্কা। ব্রাজিলের ফুটবল আর আনচেলত্তির কৌশল, দুটো প্রায় দুই মেরুতে অবস্থান করছে।
বিখ্যাত জোগো বোনিতোর সঙ্গে কার্লোর কৌশল কতটা ফলপ্রসূ হবে?
ফুটবলে সৌন্দর্যের আরেক নাম ব্রাজিলিয়ান ফুটবল। জোগো বোনিতোর ছন্দে, সাম্বা নৃত্যের তালে তালে সবুজ আয়তক্ষেত্রকে ক্যানভাস বানিয়ে শিল্পের ছোঁয়া দেয় ব্রাজিল। ফুটবলীয় কৌশলে দেশীয় ঘরানার সঙ্গে সাম্বার ছন্দ, ব্রাজিল সবসময় এক ধাপ এগিয়ে। লাতিন আমেরিকান দেশ হলেও গতি, আগ্রাসনে ইউরোপকে টক্কর দেওয়ার যে সাহস দেখিয়েছে ব্রাজিল, তা আর পারেনি কেউ। হালফিলে আর্জেন্টিনা যে পাওয়ার ফুটবল খেলছে, ব্রাজিল তার শুরুটা করে দেয় গত শতাব্দীতেই। তবু, চলতি পথে হোঁচট খেতে হয়। আসে খারাপ সময়। অজেয় ব্রাজিলের এখন ঠিক সেই ক্রান্তিকাল চলছে।
একমাত্র দল হিসেবে ২২টি বিশ্বকাপের প্রতিটিতে অংশ নিয়েছে ব্রাজিল। তারাই অনিশ্চিত আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপে। বাছাইপর্বে মেলে ধরা দূরে থাক, সেলেসাওদের দেখে মনে হয় সাদামাটা কোনো দল। বাছাইপর্বে ১৪ ম্যাচ পর পয়েন্ট টেবিলের চার নম্বরে দলটি। ১৪ ম্যাচে অর্জন করেছে ২১ পয়েন্ট। সমান পয়েন্ট হলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে তিন নম্বরে উরুগুয়ে। প্রথম চার দল কনমেবল অঞ্চল থেকে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলবে। হাতে বাকি থাকা ৪ ম্যাচে ব্রাজিলকে মেলে ধরতে হবে নিজেদের। আনচেলত্তিকে এই কারণেই উড়িয়ে এনেছে ব্রাজিল। কথা হচ্ছে, পাঁচবারের বিশ্বসেরাদের খেলার ধরন আর আনচেলত্তির খেলানোর ধরনে আছে বিস্তর ফারাক।
কীভাবে কাজ করবে নতুন ব্রাজিল?
এই জায়গায় ইতালিয়ান কোচ এগিয়েই থাকবেন বরং। তার দলের অন্যতম অস্ত্র যারা আছেন, অধিকাংশই খেলছেন ইউরোপে। বর্তমান ব্রাজিলের সেরা দুই অস্ত্র ভিনিসিয়াস জুনিয়র রিয়াল মাদ্রিদে, রাফিনহা আছেন বার্সেলোনায়। দুজনই দারুণ সময় কাটাচ্ছেন। আনচেলত্তির সরাসরি ছাত্র ভিনি। তিনি জানেন কীভাবে ভিনিকে কাজে লাগাতে হয়। রক্ষণে আছেন পিএসজি তারকা মার্কুইনহোস। তারকায় ঠাসা ব্রাজিলে এখন ম্যাচ উইনারের অভাব। অভাব মাঝমাঠের দখল নেওয়া মাস্টারমাইন্ডের। এখানেই আসল কারিশমা দেখাতে পারেন কার্লো।
কোন ফর্মেশনে ছক কষবেন?
৬৫ বছর বয়সী আনচেলত্তির প্রিয় তিনটি ফর্মেশন— ৪-৩-৩, ৪-২-৩-১, ৪-৩-১-২। মূলত, মধ্যমাঠকে প্রাধান্য দেন তিনি। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তা ছড়িয়ে দেন রক্ষণ থেকে আক্রমণে। চুক্তি নিশ্চিত হওয়ার পর রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক তারকা কাসেমিরোকে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন আনচেলত্তি। আগামী মাসে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ইকুয়েডর ও প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দুটিকে সামনে রেখে ৫০ সদস্যের প্রাথমিক দল দিয়েছে ব্রাজিল।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভেসে বেড়ানো স্কোয়াডে দেখা গেছে পুরনো সৈনিক অস্কারের নাম। বোঝা যাচ্ছে, মাঝমাঠের দখল নিতে কোনো ছাড় দেবেন না আনচেলত্তি। ঘরোয়া ফুটবল থেকে একঝাঁক তরুণকে ডাক দিয়েছেন। ফিরিয়েছেন অ্যান্টোনিকে। করিন্থিয়াস গোলরক্ষক হুগো সৌজা সবচেয়ে বড় চমক হতে পারেন ব্রাজিলের স্কোয়াডে। সবমিলিয়ে নিজস্ব ঘরানাতেই ব্রাজিলকে খেলানো ছক কষছেন ইতালিয়ান কোচ। আক্রমণে নেইমার-ভিনি-রদ্রিগোরা আনচেলত্তির ছোঁয়ায় আগুনের ফুলকি ছোটালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এই কৌশলে ব্রাজিলও খেলেছে আগে। ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে দরিভাল জুনিয়র খেলালেও সমন্বয়ের অভাবে ফল আসেনি। কার্লোর দলে সমন্বয়ের অভাব হবে না, তা বলাই যায়।
জোগো বোনিতোর ছন্দ, সাম্বার প্রদর্শনী কিংবা চিরায়ত ব্রাজিলিয়ান স্টাইলের ফুটবল দেখা থেকে বহুদিন ধরে বঞ্চিত ভক্তরা। চোখের সামনে আর্জেন্টিনার অজেয় হয়ে ওঠা আরও বেশি করে পোড়াচ্ছে তাদের। সেখান থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে আগামী বিশ্বকাপে হেক্সা উঁচিয়ে ধরার যে আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে, তা কতটা সফল হবে এর উত্তর সময়ের হাতে। তবে, প্রথা ভেঙে ব্রাজিল যখন ভিনদেশি ডেকে এনেছে, মৃতপ্রায় গাছে প্রাণের সঞ্চার করতে ফুটবলাররাও নিশ্চয়ই উজাড় করে দেবেন সবটুকু।