Ridge Bangla

মিয়ানমার যেভাবে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে

২০২১ সালে মিয়ানমারে যে সেনা অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার পর থেকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনতাকামী আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌছেছে। একদিকে শান রাজ্যের শান স্টেট আর্মি বা এসএসএ জান্তা সরকারের সাথে লড়াই চালাচ্ছে। কারেন জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কার্যক্রম চালাচ্ছে কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন বা কেএনইউ। আবার কাচিন রাজ্যে কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি সক্রিয় রয়েছে। আমাদের সীমান্তবর্তী আরাকান রাজ্যে রাখাইন জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি। অর্থাৎ মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে বিভিন্ন ফ্রন্টে ব্যস্ত রেখেছে এই স্বাধীনকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। আবার মিয়ানমারে ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোও নিজেদের প্রভাব বিস্তারে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

মিয়ানমারের (পূর্বে যার নাম ছিল বার্মা) রয়েছে দীর্ঘ এবং জটিল রাজনৈতিক ইতিহাস। নবম শতাব্দীতে রাজা আনওরাহতার নেতৃত্বে পাগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এ অঞ্চলের প্রথম একীভূত বৌদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। এরপর থেকে ব্রিটিশদের আগমনের আগপর্যন্ত সেখানে রাজতন্ত্র অব্যাহত ছিল। উনিশ শতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রসারের ফলে তিনটি অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম যুদ্ধের (১৮২৪-১৮২৬) পর আরাকান ও তেনাসেরিম অঞ্চল ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। দ্বিতীয় যুদ্ধে (১৮৫২) নিম্ন বার্মা এবং তৃতীয় যুদ্ধে (১৮৮৫) সম্পূর্ণ বার্মা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে দেশটি ব্রিটিশ ভারতের একটি প্রদেশ হিসেবে পরিচালিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানিরা মিয়ানমার দখল করে নেয়। প্রায় তিন বছর মিয়ানমার জাপানের অধীনে ছিল। জেনারেল অং সান প্রাথমিকভাবে জাপানিদের সহায়তায় বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি গঠন করলেও পরবর্তীতে মিত্রশক্তির পক্ষে যোগ দেন।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি আউং সানের রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। তবে স্বাধীনতার পূর্বেই ১৯৪৭ সালে অং সান এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা গুপ্তহত্যার শিকার হন। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এবং “বার্মিজ ওয়ে টু সোশ্যালিজম” নীতি প্রয়োগ করেন।

এই নীতির ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতায় নিপতিত হয় এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেয়। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৮৮ সালের গণঅভ্যুত্থান জনগণের মাঝে প্রতিরোধের আগুন ছড়িয়ে দেয়। এই আন্দোলনে অং সান সু চি জাতীয় নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। ২০১০ সালে সীমিত গণতান্ত্রিক সংস্কারের পর ২০১৫ সালে এনএলডি নির্বাচনে জয়লাভ করে। কিন্তু ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পুনরায় সামরিক অভ্যুত্থান দেশটিকে রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত করেছে।

ভারতের কাছে মিয়ানমার বেশ কিছু কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের ভূরাজনীতির একটি দুর্বলতা হচ্ছে সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য। ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত ভারতের চারটি রাজ্যের সাথে যুক্ত- অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর এবং মিজোরাম। এই চারটি রাজ্যই ‘সেভেন সিস্টার্স’ এর অন্তর্ভুক্ত এবং একই সাথে এই এলাকাগুলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কেন্দ্রস্থল।

যদি মিয়ানমারে অস্থিরতা থাকে, তাহলে সেই অস্থিরতা সরাসরি ভারতের এই রাজ্যগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী রয়েছে যারা দশকের পর দশক ধরে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। এই গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই মিয়ানমারের ভূখণ্ড ব্যবহার করে লুকিয়ে থাকে এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহ করে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

২০১৫ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী মিয়ানমারের ভূখণ্ডে “অপারেশন সানরাইজ” নামে একটি আক্রমণ চালিয়ে নাগা বিদ্রোহীদের ক্যাম্প ধ্বংস করে। এ থেকে বোঝা যায় মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সাথে কতটা গভীরভাবে জড়িত।

অর্থনৈতিকভাবেও ভারতের কাছে মিয়ানমারের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ভারত তার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অংশ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। এই লক্ষ্যে মিয়ানমার হলো একটি সংযোগস্থল, যেটাকে উপেক্ষা করার মতো সুযোগ নেই। ভারত যদি জলপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছাতে চায়, তাহলে তাকে মালাক্কা প্রণালীর মধ্য দিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তারপর যেতে হয়। কিন্তু মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে স্থলপথে এই দূরত্ব অনেক কমে আসে।

এই কারণে ভারত কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে, যা সীমান্তবর্তী মিজোরামকে মিয়ানমারের সিত্তোয়ে বন্দরের সাথে যুক্ত করবে। আবার মিয়ানমারে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুদ রয়েছে এবং ভারত এই গ্যাস আমদানি করতে আগ্রহী। শক্তির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে এমন একটি দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মিয়ানমার চীনের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে চীনের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা ‘মালাক্কা কনফিউশন’ নামে পরিচিত। এটি বুঝতে পারলে চীনের দিক থেকে মায়ানমারের গুরুত্ব ভালোভাবে উপলব্ধি করা যাবে। চীনের অর্থনীতি মূলত রপ্তানিনির্ভর এবং এই অর্থনীতি অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ শক্তি ও কাঁচামাল। দেশটির শিল্পের জন্য অপরিহার্য উপাদান তেল ও গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসে। এই তেল ও গ্যাস বহন করে নিয়ে আসার জন্য জাহাজগুলোকে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে আসতে হয়৷ মালাক্কা প্রণালী হলো মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ জলপথ।

ভূরাজনীতিতে এমন অনেক কিছুই ঘটতে পারে যার সম্পর্কে আগাম অনুমান করা যায় না। যদি কোনো কারণে এই প্রণালী বন্ধ হয়ে যায় বা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি প্রাথমিকভাবে একটি বড় ধাক্কা খাবে। মূলত এই আশঙ্কাতেই চীন মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিল। আর এই বিকল্প পথ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এখানেই মিয়ানমার একটি অপরিহার্য সমাধান হয়ে উঠেছে চীনের কাছে।

দেশটির মধ্য দিয়ে চীন সরাসরি ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে। এই লক্ষ্যে চীন ‘চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এই করিডোরের মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ থেকে সরাসরি মিয়ানমারের কিয়াকপিউ বন্দর পর্যন্ত সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। ফলে চীনের জন্য এখন আর সমুদ্রপথে হাজার হাজার কিলোমিটার যাত্রার প্রয়োজন হয় না। মায়ানমারের ভেতর দিয়ে সহজেই সে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি চীনের আরেকটি বড় লক্ষ্য হল তার অভ্যন্তরীণ অনুন্নত অঞ্চলগুলোর উন্নয়ন। চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো, বিশেষ করে ইউনান প্রদেশ, পূর্ব উপকূলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। মিয়ানমারের সাথে বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপিত হলে এই অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হবে।

মিয়ানমার প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। চীনের ক্রমবর্ধমান শিল্পের জন্য এই সম্পদগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিকল্প হিসেবে মিয়ানমার খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে।

এগুলোর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। চীন জানে যে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। মিয়ানমারকে নিজের প্রভাবাধীনে রাখতে পারলে চীন এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে। চীনের বহুল আকাঙ্ক্ষিত ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশল বাস্তবায়ন করতে মিয়ানমার অপরিহার্য একটি দেশ।

ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য মিয়ানমার যেমন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি দেশ, আবার চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ভারত মহাসাগরে আমেরিকা ও ভারতের প্রভাব খর্বকরণ ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহের জন্যও দেশটির কাছে মিয়ানমারের গুরুত্ব কোন অংশেই কম নয়।

মিয়ানমারের ভৌগলিক অবস্থান তার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। এর পাশাপাশি দেশটিতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস, যা উদীয়মান দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। সামনের দিনগুলোতে মিয়ানমারে ভারত ও চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বহু গুণে বৃদ্ধি পাবে– এটি এখন থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে। চীন এখনও ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও সামনে কী হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। চীনের সামরিক বা বেসামরিক সমস্ত সরকারই মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি মেনে চলার চেষ্টা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে চীনের উপরে দেশটির নির্ভরশীলতা অনেক বেড়েছে।

তথ্যসূত্র:

১) Myanmar’s Troubled History: Coups, Military Rule, and Ethnic Conflict

২) India’s realpolitik Myanmar policy

৩) Decoding China’s multi-stakeholder strategy in Myanmar

This post was viewed: 19

আরো পড়ুন