১ জানুয়ারি দেশে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। সে অনুযায়ী বছরের প্রথম দিনেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে যাওয়ার কথা। এবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাত ধরে বছরের প্রথম দিনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ নতুন বই পৌঁছালেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত ১৫ বছর ধরেই সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছাতে পারেনি এনসিটিবি।
বছরের পর বছর ধরে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে সময়মতো পাঠ্যবই না পৌঁছানোর নেপথ্যে কাজ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠেছে, বিনামূল্যের সরকারি বই ছাপাতে কৃত্রিম সংকট ও বিলম্ব তৈরি করে প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার অবৈধ গাইড বই ও নোট বই বাণিজ্য চলছে। এই বিশাল অংকের মুনাফার ভাগ যাচ্ছে কিছু মুদ্রাকর, প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের পকেটে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি বছর জানুয়ারির এক তারিখে উৎসব করে বই দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থী মার্চ-এপ্রিল মাসের আগে সব বই হাতে পায় না। এই সুযোগ কাজে লাগায় গাইড বইয়ের প্রকাশকরা। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হয়ে গেলেও মূল বই না থাকায় অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে চড়া দামে গাইড ও নোট বই কেনেন। শিক্ষাবিদদের মতে, সময়মতো পাঠ্যবই সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এই বিশাল অংকের গাইড বাণিজ্যের বাজার ধসে পড়ত। আর সেটি ঠেকাতেই প্রতি বছর মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় কোনো না কোনো কৃত্রিম জটিলতা সৃষ্টি করা হয়।
চলতি বছর ও বিগত বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে মুদ্রণ সিন্ডিকেট প্রায়ই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। কখনো কাগজের দাম বৃদ্ধি, কখনো দরপত্রের জটিলতা, আবার কখনো কারিকুলাম পরিবর্তনের অজুহাতে বই ছাপার কাজ বিলম্বিত করা হয়। তথ্যানুসারে, সরকারি প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি দামে বই ছাপার কাজ হাতিয়ে নিচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু প্রেসের সিন্ডিকেট। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে শত শত কোটি টাকা।
শুধু তা-ই নয়, নিম্নমানের কাগজে বই ছাপিয়েও বিপুল অর্থ পকেটস্থ করছে এই চক্র। নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত জিএসএম ও উজ্জ্বলতার কাগজ ব্যবহারের কথা থাকলেও প্রায় ২০ শতাংশ বইয়ে তা মানা হচ্ছে না। এর মাধ্যমে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ মুনাফা অর্জনের অভিযোগ রয়েছে মুদ্রাকরদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে কাগজ মিল মালিকরাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কাগজের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে এনসিটিবি অনুমোদিত মুদ্রণখানাগুলো সময়মতো কাগজ পায় না, ফলে ছাপার কাজ বন্ধ থাকে দিনের পর দিন। আর এই সময়টুকুই হচ্ছে গাইড বই বাণিজ্যের মূল সময়।
সম্প্রতি এনসিটিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, সময় স্বল্পতা এবং মুদ্রাকরদের সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সময় তারা অসহায় থাকেন। পুনঃদরপত্র করার মতো সময় না থাকায় বাধ্য হয়ে বেশি দামে কাজ দিতে হয়। তবে সংস্কারপন্থী কর্মকর্তাদের মতে, এনসিটিবির ভেতরে থাকা প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মদত ছাড়া এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ৫ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য বন্ধ করতে হলে পাঠ্যবই মুদ্রণ প্রক্রিয়াকে বছরের শুরু থেকেই কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ই-বুক বা ডিজিটাল ফরমেটে বইয়ের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করলে গাইড বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমানো সম্ভব।