Ridge Bangla

২০২৫ সালে হতাশা ও অভিমানে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

সারা দেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেড়েই চলেছে। ২০২৫ সালে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা মিলিয়ে মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। দেশের ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই সমীক্ষা প্রস্তুত করা হয়েছে।

সমীক্ষা অনুযায়ী, আত্মহত্যাকারী ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে স্কুল পর্যায়ে ১৯০ জন (৪৭.৪০%), কলেজে ৯২ জন (২২.৮%), বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন (১৯.১০%) এবং মাদ্রাসায় ৪৪ জন (১০.৭২%)। সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে স্কুল পর্যায়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৈশোরের শুরুতেই আবেগীয় অস্থিরতা, পরিচয় সংকট ও একাডেমিক চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলছে।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ২৪৯ জন (৬১.৮%) নারী এবং ১৫৪ জন (৩৮.২%) পুরুষ। এর মধ্যে স্কুল পর্যায়ে ১৩৯ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ, কলেজে ৫০ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১ জন পুরুষ ও ৩৬ জন নারী।

বিশ্লেষকদের মতে, কৈশোরে মেয়েরা পারিবারিক ও সামাজিক চাপ, সম্পর্কজনিত টানাপড়েন এবং আবেগীয় সংকটে বেশি ভেঙে পড়ছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছেলেদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থান সংকট বড় কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

কারণভিত্তিক বিশ্লেষণে আত্মহত্যার জন্য মূল প্রভাবক হিসেবে উঠে এসেছে হতাশা ও অভিমান। প্রতিবেদনে দেখা যায়, আত্মহত্যার জন্য হতাশা দায়ী ২৭.৭৯% এবং অভিমান দায়ী ২৩.৩২%।

হতাশাজনিত ঘটনায় নারী ৬২ জন (৫৫.৩৫%) এবং পুরুষ ৫০ জন (৪৪.৬৫%)। অভিমানের ক্ষেত্রে নারী ৫৮ জন (৬১.৭০%) এবং পুরুষ ৩৬ জন (৩৮.২৯%)।

এছাড়া একাডেমিক চাপে ৭২ জন (এর প্রায় ৭১% নারী), প্রেমঘটিত কারণে ৫৩ জন (১৩.১৫%), পারিবারিক টানাপড়েনে ৩২ জন (৭.৯৪%), মানসিক অস্থিতিশীলতায় ২৫ জন (৬.২০%) এবং যৌন নির্যাতনের কারণে ১৪ জন (৩.৪৭%) আত্মহত্যা করেছে। সাইবার বুলিংয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে ঝুঁকিতে কিশোররা। ১৩–১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৬৬.৫০%। এদের মধ্যে ১৯০ জন নারী ও ৭৮ জন পুরুষ। ২০–২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ২২.৬% (পুরুষ ৫১, নারী ৪০)।

আরও উদ্বেগজনক ঘটনা হলো ১ থেকে ১২ বছর বয়সী ৪৪ জন শিশুর আত্মহত্যার তথ্য, যা সমাজের জন্য গভীর সতর্কবার্তা।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ১১৮ জন (২৯.২৪%), চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৩ জন (১৫.৬৩%), বরিশাল বিভাগে ৫৭ জন (১৪.৪%) এবং রাজশাহী বিভাগে ৫০ জন (১২.৪০%)। সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, এটি কোনো একক অঞ্চলের সমস্যা নয়; বরং জাতীয় পরিসরে বিস্তৃত এক সামাজিক সংকট।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যাকারী ৭৭ জনের মধ্যে ৪৪ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের, ১৭ জন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের, ৬ জন মেডিকেল কলেজের এবং ১০ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজের।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হতাশা (৩৬.৩৬%) ও প্রেমঘটিত কারণ (২৯.৫৪%) উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও মানসিক অস্থিরতার জন্য আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে ১৮.১৮%। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে হতাশার হার আরও বেশি (৪৭.০৫%)। এছাড়া অভিমান ১৭.৬৭%, পারিবারিক টানাপড়েন ১১.৭৬% এবং প্রেমঘটিত কারণ ৫.৮৮%।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পরিবারে খোলামেলা যোগাযোগের অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ঘাটতি এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সামাজিক অজ্ঞতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সামাজিক সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ, সামাজিক স্টিগমা কমাতে সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সাইকো-সোশ্যাল সহায়তা কার্যক্রম।

সংগঠনের সদস্যরা বলেন, শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যান কেবল একটি প্রতিবেদন নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য স্পষ্ট সতর্কসংকেত। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন