গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ইতিহাসে গত ২০২৫ সাল ছিল রক্তক্ষয়ী ও বিষাদময় এক অধ্যায়। নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংস্থা ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট’ (সিপিজে) সম্প্রতি তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে দায়িত্ব পালনকালে রেকর্ড ১২৯ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি ১৯৯২ সাল থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করার পর এক বছরে এটিই সর্বোচ্চ সাংবাদিক নিহতের সংখ্যা।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের মতো গত বছর নিহত হওয়া মোট গণমাধ্যমকর্মীদের দুই-তৃতীয়াংশের মৃত্যুর জন্যই দায়ী ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। এ সময় অন্তত ৮৬ জন সাংবাদিক ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই গাজায় কর্মরত ফিলিস্তিনি সাংবাদিক। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত এক বছরে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করে হামলার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যার বড় অংশের জন্য দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী দায়ী। তবে গাজায় বহিরাগতদের প্রবেশে কড়াকড়ির পাশাপাশি তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুধু গাজা নয়, ইয়েমেনেও গণমাধ্যমকর্মীরা ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন। গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সানায় এক হুতি মিডিয়া সেন্টারে বিমান হামলায় ৩১ জন সংবাদকর্মী নিহত হন, যাকে সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া সুদানে ৯ জন, মেক্সিকোতে ৬ জন, ইউক্রেনে ৪ জন ও ফিলিপাইনে ৩ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি উদ্বেগজনক দিক হলো সাংবাদিকদের ওপর হামলায় ড্রোন ব্যবহার। ২০২৩ সালে যেখানে মাত্র ২ জন সাংবাদিক ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ৩৯-এ দাঁড়িয়েছে।
সিপিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোডি গিন্সবার্গ এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, যখনই কোনো দেশে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করা হয়, তাদের হত্যা করা হয়, তখন প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের তথ্যের অধিকার এবং গণতন্ত্রকেই হত্যা করা হয়। তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৭টি ঘটনায় সাংবাদিকদের সুপরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে। যার সিংহভাগ ঘটনার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার হয়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বরং বাংলাদেশ, মেক্সিকো, পেরু, কলম্বিয়া ও গুয়েতেমালার মতো দেশগুলোতেও সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে দুর্নীতি, অপরাধ জগত এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হচ্ছেন। সিপিজে কর্তৃক সর্বশেষ ১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৩২৯ জন সাংবাদিক এখনো কারাবন্দি রয়েছেন। এর পাশাপাশি অন্তত ৮৪ জন সাংবাদিক নিখোঁজ।
প্রতিবেদনের এই চিত্র বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে মুক্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র চরম হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সাংবাদিকদের সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ না রেখে এখন কার্যকরভাবে প্রয়োগের দাবি তুলছে সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট মহল।