Ridge Bangla

হরমুজ প্রণালী বন্ধ: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার পরই ইউরোপীয় বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম হুহু করে বৃদ্ধি পায়। লন্ডন আইসিইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারির পর প্রথমবারের মতো ইউরোপের এক্সচেঞ্জে গ্যাসের দাম প্রতি ১ হাজার ঘনমিটারে ৭০০ ডলার অতিক্রম করেছে। নেদারল্যান্ডসের টিটিএফ হাবে এপ্রিলের আসন্ন চুক্তির মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১১ ডলারে।

মূল্যবৃদ্ধি মাত্র ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং বাজারে এই অস্থিরতা নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার মস্কো এক্সচেঞ্জে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সকাল ৭টা পর্যন্ত সূচক শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ২,৮৪৮ দশমিক ৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। রাশিয়ার ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের প্রধান নির্বাহী কিরিল দিমিত্রিভ মনে করছেন, প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হতে পারে এবং তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

রাশিয়ার বিনিয়োগ কৌশলবিদ স্তানিস্লাভ ক্লেশচেভ জানান, রুশ তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ঊর্ধ্বগতিই মস্কো সূচককে ২,৮০০ পয়েন্টের বাধা কাটিয়ে ওপরে তুলেছে। তবে ধাতু বাজারেও প্রভাব পড়েছে। কমেক্স এক্সচেঞ্জে রুপার ফিউচার চুক্তির দাম ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে প্রতি ট্রয় আউন্স ৮৩ দশমিক ০০৫ ডলারে লেনদেন হচ্ছে, আর সোনার এপ্রিল চুক্তির দাম সামান্য বেড়ে প্রতি ট্রয় আউন্স ৫,৩১৬ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা চলতে থাকলে সোনার দাম ৬,০০০ ডলার অতিক্রম করতে পারে।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য এটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফিলিপ লেন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত ও সরবরাহ কমে গেলে মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে এবং উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে রাশিয়ার অবস্থান আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করছেন মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জন কাভুলিচ। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে কাতারের এলএনজি পরিবহনে সমস্যার কারণে রাশিয়ার এলএনজি রপ্তানিকারকরা সাময়িকভাবে বড় রাজস্ব উপার্জন করতে পারে। ইমপ্লিমেন্টার গবেষণা পরিচালক মারিয়া বেলোভা জানান, রাশিয়ার এলএনজি রপ্তানিকারকরা এই বাজারে সুবিধাভোগী হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক মহলে এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়ে গেছে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রবেশদ্বার। এটি বন্ধ থাকায় তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যার কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরবের আরামকোর তেল শোধনাগারে হামলার ঘটনায় উত্তেজনা আরও বাড়েছে। ইরান দাবি করছে, হামলার নেপথ্যে ইসরায়েলের হাত রয়েছে এবং এটি একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন। ইরান জানিয়েছে, তারা কখনোই সৌদি তেলের স্থাপনায় হামলা চালায়নি; বরং ইসরায়েল তাদের সাম্প্রতিক সামরিক কর্মকাণ্ড থেকে আঞ্চলিক দেশগুলোর মনোযোগ সরানোর উদ্দেশ্যে এই হামলা চালিয়েছে।

ইরানি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, পরবর্তী সম্ভাব্য ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজিরাহ বন্দরও রয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যেই কুয়েতের প্রতিরক্ষা বাহিনী ইরানের ছোড়া ১৭৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৮০টিরও বেশি ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানায় কুয়েত সেনার ২৭ জন সদস্য আহত হয়েছেন। কুয়েত প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে এই প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বিপর্যয় বিশ্ববাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রতিক্রিয়াশীলভাবে বাড়ছে, আর রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানিকারক দেশগুলো সাময়িকভাবে সুবিধা পাচ্ছে। তেলের দামও প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার অতিক্রমের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদী উত্তেজনা চলতে থাকলে সোনার দামও ইতিহাসের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়ছে। ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন কমে যাবে এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও তেল-গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর রাজস্ব সাময়িকভাবে বাড়বে। তবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আরও জটিলতার সৃষ্টি করবে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালী ও সৌদি তেলের সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোকে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সতর্ক হতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অস্থিরতা চলতে থাকলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি, শেয়ারবাজার ও মূল্যবান ধাতুর বাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য তৎপর হয়েছে। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের ভবিষ্যৎ এবং এর প্রভাব বিশ্ববাজারে কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। মধ্যপ্রাচ্যে এই উত্তেজনা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

This post was viewed: 8

আরো পড়ুন