গ্যালারি ভর্তি হাজার হাজার মানুষের উন্মাদনা, মাঠের সবুজ ঘাসে বিশ্বসেরা তারকাদের পায়ের জাদু আর টেলিভিশনের পর্দায় কোটি কোটি মানুষের চোখ—খেলাধুলা এখন আর কেবল সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি এখন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য আর তার চেয়েও বড় এক রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি। বর্তমান সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন কিন্তু প্রভাবশালী শব্দ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তা হলো ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ (Sportswashing)। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিতর্কিত মানবাধিকার রেকর্ড বা রাজনৈতিক ভাবমূর্তি সম্পন্ন রাষ্ট্রগুলো খেলাধুলার বিশাল জৌলুসকে ব্যবহার করে নিজেদের নেতিবাচক ইমেজ ধুয়েমুছে সাফ করার চেষ্টা করে। দিনে দিনে এই প্রক্রিয়ার ব্যবহার বাড়ছেই।
স্পোর্টসওয়াশিং আসলে কী?
সহজ কথায়, স্পোর্টসওয়াশিং হলো এমন একটি কৌশল যেখানে কোনো দেশ বা সংস্থা খেলাধুলার বড় কোনো ইভেন্ট আয়োজন করে, বিখ্যাত কোনো ক্লাব কিনে নেয় কিংবা বিশ্বসেরা অ্যাথলেটদের স্পনসর করে নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নয়ন করার চেষ্টা করে। এর মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মহলের নজর সেই দেশের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড (যেমন: মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাকস্বাধীনতা হরণ বা যুদ্ধবিগ্রহ) থেকে সরিয়ে মাঠের উত্তেজনার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। এটি এক ধরনের ‘রেপুটেশন লন্ডারিং’ বা ভাবমূর্তি পাচার, যেখানে খেলাধুলা হয়ে ওঠে এক বিশাল পর্দার মতো, যা আড়ালে থাকা অন্ধকার সত্যকে ঢেকে রাখে।
ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমান
স্পোর্টসওয়াশিং কোনো নতুন ধারণা নয়। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক ছিল এর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও আদি উদাহরণ। অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি জার্মানি সেই অলিম্পিককে ব্যবহার করেছিল তাদের তথাকথিত ‘আর্য শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে। এরপর ১৯৭৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনায় যখন আয়োজিত হয়, তখন দেশটিতে চলছিল জান্তা সরকারের স্বৈরশাসন। হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে গুম ও হত্যা করার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপের জৌলুসে সেই সময়ের সরকার বিশ্বকে একটি স্থিতিশীল দেশের চিত্র দেখাতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই স্পোর্টসওয়াশিং নিয়েছে এক বিধ্বংসী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিশেষ করে তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন ইউরোপীয় ফুটবল এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ডিসিপ্লিনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।
বর্তমান বিশ্বের প্রধান প্রভাবকসমূহ
বর্তমান সময়ে স্পোর্টসওয়াশিংয়ের কথা উঠলেই সবার আগে নাম আসে কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল এই প্রক্রিয়ার এক চূড়ান্ত উদাহরণ। ছোট একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও ২২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করে কাতার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আসর আয়োজন করে। যদিও আয়োজনের পেছনে শ্রমিকদের ওপর অমানবিক আচরণ কিংবা বিপরীত মতাদর্শের মানুষদের মানবাধিকার কেড়ে নিয়া সম্পর্কে বিতর্ক ছিল তুঙ্গে, কিন্তু চূড়ান্ত বাঁশি বাজার পর বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের মনে রয়ে গেল লিওনেল মেসি আর কিলিয়ান এমবাপের রোমাঞ্চকর ফাইনালের স্মৃতি। এখানেই স্পোর্টসওয়াশিংয়ের সার্থকতা- বিতর্ককে ছাপিয়ে আবেগ জয়ী হয়।
অন্যদিকে, সৌদি আরব বর্তমানে স্পোর্টসওয়াশিংয়ের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়। তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার আওতায় তারা কেবল ফুটবল নয়, গলফ, টেনিস এবং ফর্মুলা ওয়ান রেসিংয়েও বিপুল বিনিয়োগ করছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার কিংবা করিম বেনজেমার মতো মহাতারকাদের সৌদি লিগে নিয়ে আসা কেবল ফুটবলের উন্নয়ন নয়, বরং দেশটিকে একটি প্রগতিশীল ও উন্মুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে জাহির করার চেষ্টা। লিভ গলফ (LIV Golf) তৈরির মাধ্যমে তারা মার্কিন গলফ ইন্ডাস্ট্রিতে যে কম্পন সৃষ্টি করেছে, তা অভাবনীয়। একইভাবে ম্যানচেস্টার সিটি (সংযুক্ত আরব আমিরাত) বা নিউক্যাসল ইউনাইটেড (সৌদি আরব) এর মতো ক্লাবগুলোর মালিকানা কিনে নিয়ে ভক্তদের আবেগের সাথে নিজেদের রাষ্ট্রকে জড়িয়ে ফেলছে এই দেশগুলো।
কেন দেশগুলো এটি করে?
প্রশ্ন উঠতে পারে, শত শত কোটি ডলার খরচ করে এই খেলাধুলার পেছনে রাষ্ট্রের কী লাভ? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তিনটি প্রধান কারণে
প্রথম কারণ হিসেবে ‘সফট পাওয়ার’ অর্জনের কথা বলা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য কেবল সামরিক শক্তি (হার্ড পাওয়ার) যথেষ্ট নয়। খেলাধুলার মাধ্যমে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করা যায়।
দ্বিতীয়ত, এটি অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এই দেশগুলো নিজেদের আধুনিক ও ক্রীড়াবান্ধব হিসেবে পরিচিত করতে চায়।
তৃতীয়ত, নিজ দেশের ভেতরে ‘লেজিটিমেসি’ প্রতিষ্ঠা করা। দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজেদের আধুনিক শাসক হিসেবে প্রমাণ করা এবং জাতীয়তাবোধকে চাঙ্গা করা।
সমালোচনা ও নৈতিক সংকট
মানবাধিকার সংস্থাগুলো, বিশেষ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিয়মিতভাবে স্পোর্টসওয়াশিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাদের মতে, এটি অপরাধকে আড়াল করার একটি অত্যন্ত অমানবিক উপায়। অনেক সময় খেলোয়াড় এবং ভক্তরাও এক নৈতিক সংকটে পড়েন। একজন ফুটবলার যখন কোটি টাকার চুক্তিতে কোনো বিতর্কিত রাষ্ট্রের হয়ে প্রচার করেন, তখন তিনি কি পরোক্ষভাবে সেই দেশের অন্যায়ের অংশীদার হন? এই প্রশ্নটি এখন আধুনিক ক্রীড়া জগতের সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
স্পোর্টসওয়াশিং হলো গ্ল্যামার আর রাজনীতির এক বিপজ্জনক মিশ্রণ। খেলাধুলা আমাদের আবেগ, আমাদের প্রেরণা। কিন্তু যখন সেই আবেগকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা ক্রীড়াসুলভ মানসিকতার অবমাননা করে। মাঠের গোল বা গ্যালারির গর্জন যখন দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় অপরাধ ও অনৈতিক কার্যকলাপকে আড়াল করে, তখন এর নেপথ্যের কুশীলবদের নেপথ্যের উদ্দেশ্যও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। রাষ্ট্রগুলোর এই নতুন কৌশলের যুগে সচেতনতাই পারে খেলাধুলার বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে। শেষ পর্যন্ত মাঠের বিজয় যেন কোনো মানবিক পরাজয়কে আড়াল করতে না পারে, সেটাই হওয়া উচিত কাম্য।