Ridge Bangla

স্ট্রাটেজিক হেজিং: যে কৌশলের উপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি

​একবিংশ শতাব্দীতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে বিশ্বশক্তিগুলোর মনোযোগ ভালোভাবেই আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে এই ব-দ্বীপ। তবে এই আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকা যতটা আশীর্বাদের, ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জের। বিশেষ করে যখন বিশ্ব রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের মতো বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতায় বিভক্ত। এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশ যে নীতিটি অবলম্বন করে নিজের অবস্থান সুসংহত করছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের ভাষায় তাকে বলা হয় ‘স্ট্রাটেজিক হেজিং’ বা কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা।

​স্ট্রাটেজিক হেজিং কী?

​সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ‘স্ট্রাটেজিক হেজিং’ হলো এমন এক কৌশল যেখানে একটি রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে যোগ না দিয়ে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। অর্থাৎ একাধিক বৃহৎ শক্তি যখন একটি দেশকে নিজেদের বলয়ে টেনে নেয়ার চেষ্টা করে, তখন কোন ব্লকেই পুরোপুরি যোগ না দিয়ে বরং দুই পক্ষের সাথে সুসম্পর্ক টিকিয়ে রাখাকেই স্ট্রাটেজিক হেজিং বলা যেতে পারে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকি কমানো এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নীতির মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে। এই অনুচ্ছেদটিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি বলা যেতে পারে।

​ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যের রসায়ন

​বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হয় এশীয় দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাজিত হওয়ার আগে দুটো দেশই একই ভূখন্ডের অংশ ছিল হাজার বছর ধরে। নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক সংযোগের কারণে ভারতের গুরুত্ব অপরিসীম।

অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান সহযোগী। ​পদ্মা সেতু (নিজস্ব অর্থায়নে হলেও কারিগরি সহায়তা), কর্ণফুলী টানেল, এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ যখন বাড়ছে, তখন আবার ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিসহ কানেক্টিভিটি বাড়াতে বাংলাদেশ পিছপা হচ্ছে না। বাংলাদেশ খুব চতুরতার সাথে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এবং ভারতের সঙ্গে গভীর নিরাপত্তা সম্পর্কের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। এটিই হেজিং কৌশলের সার্থকতা, যেখানে কোনো এক পক্ষের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে দুই পক্ষ থেকেই সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে।

​ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং পশ্চিমা বিশ্ব

​বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (IPS) একটি বড় আলোচনার বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা যখন এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে চায়, তখন বাংলাদেশ নিজস্ব ‘ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক’ ঘোষণা করেছে। এখানে বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই অঞ্চলকে সে কোনো সামরিক জোটের আখড়া হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং অবাধ চলাচলের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চায়। ​যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার এবং অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ। গণতন্ত্র বা মানবাধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে টানাপোড়েন থাকলেও, কৌশলগত কারণে দুই দেশই একে অপরের উপর নির্ভরশীল। আবার রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাশিয়ার মতো পুরনো বন্ধুর গুরুত্বও বজায় রাখছে।

​হেজিং কেন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য?

​বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ এবং বাজার সুবিধা প্রয়োজন। কোনো একটি ব্লকে ঢুকে পড়লে অন্য ব্লকের বাজার বা বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকি থাকে, যা বাংলাদেশ নিতে চায় না।

​এর পাশাপাশি ছোট বা মাঝারি শক্তির দেশগুলো বড় শক্তির লেজুড়বৃত্তি করলে অনেক সময় নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারায়। হেজিং কৌশল বাংলাদেশকে একটি ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy) প্রদান করে। মিয়ানমার থেকে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের একই সঙ্গে চীনের সমর্থন এবং পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োজন। কোনো এক পক্ষকে ত্যাগ করলে এই সংকট সমাধান আরও অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এই কৌশলের ​চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

​তবে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা অনেকটা ‘সরু সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটার’ মতো। চীন এবং ভারতের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন নিরপেক্ষ থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিটি শক্তিই চায় বাংলাদেশ তাদের দিকে স্পষ্টভাবে ঝুঁকে পড়ুক। ​বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের এই হেজিং কৌশল ভবিষ্যতে আরও বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ যেভাবে দক্ষিণ চীন সাগর বা ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ইস্যুতে ভারসাম্যমূলক অবস্থান নিয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে।

​স্ট্রাটেজিক হেজিং কেবল একটি কূটনীতি নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের এক আধুনিক ঢাল। বিশ্ব ব্যবস্থার মেরুকরণ যেদিকেই যাক না কেন, বাংলাদেশ যদি তার উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তবে এই ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে আরও দক্ষ হতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তাই হবে আগামী দিনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি। কৌশলগত এই অবস্থানের মাধ্যমেই বাংলাদেশ এশিয়ায় সংযোগকারী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন