Ridge Bangla

সুরের ইন্দ্রজাল ছিঁড়ে আশা ভোঁসলের বিদায়

ফ্রেডরিখ নিৎশে একবার বলেছিলেন, “সংগীত ছাড়া জীবন একটি ভুল।” তারও আগে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার লিখেছিলেন, “যারা সঙ্গীত ভালোবাসে না, তারা খুন করতে পারে।” মূলত সঙ্গীত এমনই, যা মুহূর্তেই আমাদের হৃদয়কে কোমলতার স্পর্শে শীতল করে তুলতে পারে। তাই মানুষ যুগ যুগ ধরে সঙ্গীতের প্রতি নিবেদন করেছে তার ভালোবাসা, সুরে সুরে প্রকাশ করেছে আবেগ ও অনুভূতির গল্প।

এই সংগীতেরই এক বিচিত্র ধারা দেখা যায় ভারতীয় উপমহাদেশে, যার মূলে রয়েছে হাজার বছরের পুরনো শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য। উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি (রাগভিত্তিক) এবং দক্ষিণ ভারতীয় ধারার পাশাপাশি লোকসঙ্গীত, ভজন, গজল এবং আধুনিক চলচ্চিত্র সঙ্গীতও এই অঞ্চলের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিচিত্র ধারার এই সঙ্গীতের কল্যাণে এই অঞ্চলে জন্ম নিয়েছে কালজয়ী সব সংগীতশিল্পী। তাদেরই একজন সদ্য প্রয়াত আশা ভোঁসলে।

ভারতীয় সুরসাম্রাজ্ঞী ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারিণী আশা ভোঁসলে ৯২ বছর বয়সে পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। আজ রোববার দুপুর ১২টার দিকে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর ছেলে আনন্দ ভোঁসলে মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন। গতকাল হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক ধারণা হৃদরোগ হলেও তাঁর নাতনি জানাই ভোঁসলে জানান, চরম ক্লান্তি ও বুকে সংক্রমণের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল।

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর রক্তে মিশে ছিল সুর। বাবা পণ্ডিত দিননাথ মঙ্গেশকরের হাত ধরে হাতেখড়ি হলেও শৈশবেই পিতৃহারা হন তিনি। পরিবারের বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের ছায়াতলে বেড়ে উঠলেও সংগীতের জগতে নিজের পথ তৈরিতে আশাকে করতে হয়েছে কঠোর সংগ্রাম। শুরুতে বি ও সি গ্রেডের সিনেমায় গান গেয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন তিনি। বড় বোন লতা যখন ধ্রুপদী ঢঙে জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তখন আশা খুঁজছিলেন নিজের স্বকীয়তা।

ব্যক্তিগত জীবনেও দুর্যোগ সইতে হয়েছে তাঁকে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে গণপত রাও ভোঁসলেকে বিয়ে করে ঘর ছেড়েছিলেন, কিন্তু সেই সংসারে জোটে কেবল নির্যাতন। সন্তানদের নিয়ে মায়ের বাড়িতে ফিরে এসে সংগীতকেই করেন জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা।

১৯৫০-এর দশকে যাত্রা শুরু করলেও আশার প্রকৃত ব্রেকথ্রু আসে ষাটের দশকে। বিশেষ করে ‘তিসরি মঞ্জিল’ সিনেমার গানে তাঁর চঞ্চল কণ্ঠ সে সময়ের প্রজন্মকে মাতিয়ে দেয়। তাঁর কণ্ঠের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। একদিকে তিনি যেমন গেয়েছেন ‘পিয়া তু আব তো আজা’র মতো ক্যাবারে, অন্যদিকে ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’-এর মতো গজল। আবার ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’র মতো রোমান্টিক কিংবা ‘দম মারো দম’-এর মতো পপ ধারার গানেও তিনি ছিলেন অনন্য। সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মনের সঙ্গে তাঁর পেশাগত ও ব্যক্তিগত রসায়ন ভারতীয় চলচ্চিত্রে সংগীতের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

আশা ভোঁসলে কেবল ভারতের নন, তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল উপমহাদেশের বাইরেও। ১২ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক রেকর্ড করা শিল্পীদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। নব্বইয়ের দশকে এ আর রাহমানের সুরে নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন আইকন। দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মবিভূষণ এবং অসংখ্য জাতীয় ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে ভূষিত এই শিল্পী গ্র্যামি পর্যন্তও পৌঁছে দিয়েছিলেন তাঁর সুরের আবেদন।

আশা ভোঁসলে নেই, কিন্তু তাঁর ফেলে যাওয়া হাজারো গান যুগ যুগান্তরে বেজে চলবে প্রতিটি সুরপ্রেমীর হৃদয়ে। নিৎশে হয়তো ঠিকই বলেছিলেন, তাঁর মতো শিল্পীদের গান ছাড়া আমাদের যাপিত জীবন সত্যিই এক বড় ‘ভুল’ হয়ে রয়ে যেত।

This post was viewed: 10

আরো পড়ুন