Ridge Bangla

সাম্রাজ্যের সূর্যাস্ত: কেন পতন ঘটে ইতিহাসের পরাশক্তিগুলোর?

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে নানারকম সাম্রাজ্যের উত্থান দেখা যায়। কিন্তু যত সময়ই লাগুক না কেন, একসময় পতন ঘটে সাম্রাজ্যগুলোর। বলা যায়, ​ইতিহাসের চাকা সবসময় ঘুরপাক খায় উত্থান আর পতনের আবর্তে। একসময় যে সাম্রাজ্যের সীমানায় সূর্য অস্ত যেত না, এখন তাদের অস্তিত্ব কেবল জাদুঘরের নিথর পাথরে কিংবা ধুলোমাখা পাণ্ডুলিপিতে। রোমান সাম্রাজ্যের কয়েক শতাব্দীর আধিপত্য থেকে শুরু করে মোগলদের জৌলুস- সবই একসময় ধূলিসাৎ হয়েছে। ইতিহাসবিদ পল কেনেডি থেকে শুরু করে এডওয়ার্ড গিবন পর্যন্ত অনেকেই এই পতনের কারণ খুঁজতে গিয়ে কিছু সাধারণ সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন। কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে নয়, বরং একাধিক জটিল সমস্যার সমন্বয়েই একটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

​ইতিহাসবিদ পল কেনেডির মতে, সাম্রাজ্যগুলোর পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘ইম্পেরিয়াল ওভারস্ট্রেচ’ বা অতি-প্রসারণ। একটি সাম্রাজ্য যখন তার অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি ভূখণ্ড জয় করে ফেলে, তখন তা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিশাল সীমানা পাহারা দিতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ সৈন্য ও অর্থের প্রয়োজন হয়। রোমান সাম্রাজ্য বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অধিকৃত অঞ্চলের বিদ্রোহ দমন করতে গিয়েই তাদের রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়েছিল। সামরিক ব্যয়ের ভার যখন সাধারণ মানুষের করের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখনই পতনের ঘণ্টা বাজতে শুরু করে।

​অর্থনীতি হলো একটি সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড। যখন এই মেরুদণ্ড ভেঙে যায়, তখন সাম্রাজ্যও বেশিদিন টিকতে পারে না। রোমান সাম্রাজ্যের শেষ দিকে দেখা গিয়েছিল মুদ্রার মান আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া এবং আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। অতিরিক্ত করের বোঝা এবং কৃষিকাজে স্থবিরতা অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সম্রাটদের বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং বিশাল সেনাবাহিনী পালতে গিয়ে রাজকোষ এতটাই শূন্য হয়ে পড়েছিল যে কর্মচারী ও সৈন্যদের বেতন দেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।

​একটি সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন বীর ও দূরদর্শী নেতারা, কিন্তু তা ধ্বংস করেন তাদের অযোগ্য উত্তরসূরিরা। প্রায় প্রতিটি সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, প্রথমদিকের শাসকরা কঠোর পরিশ্রমী ও প্রজাবৎসল হলেও পরের দিকের শাসকরা প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও ভোগবিলাসে মত্ত থাকতেন। অটোমান বা মোগল সাম্রাজ্যের শেষদিকের শাসকরা ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়লে জনগণের আস্থা হারিয়ে যায়। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে যখন কেন্দ্রীয় শাসন শিথিল হয়ে পড়ে, তখন প্রাদেশিক গভর্নররা স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করেন, যা সাম্রাজ্যের ভাঙনকে ত্বরান্বিত করে।

​সাম্রাজ্যের ভেতরে যখন ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন বিপ্লব বা গৃহযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রাচীন রোমে ভূমিহীন কৃষকদের ক্ষোভ এবং অভিজাতদের বিলাসিতা গৃহযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল। অভ্যন্তরীণ কোন্দল একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে এতটাই দুর্বল করে দেয় যে, সামান্য বৈদেশিক আক্রমণেই তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। সামাজিক সংহতি নষ্ট হওয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘দেশপ্রেম’ বা ‘সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য’ হারিয়ে যাওয়া পতনের একটি বড় লক্ষণ।

​অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হয়ে পড়া সাম্রাজ্যগুলো সবসময়ই প্রতিবেশী বা উদীয়মান শক্তিগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করেছিল বার্বারিয়ান বা যাযাবর জাতিগুলোর আক্রমণ। আবার মোগল সাম্রাজ্যের সূর্য যখন অস্তমিত হচ্ছিল, তখন পারস্যের নাদির শাহের আক্রমণ এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক অনুপ্রবেশ তাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়।

প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া এবং শত্রুর রণকৌশল বুঝতে ব্যর্থ হওয়াও সামরিক পরাজয়ের বড় কারণ। তবে ​আধুনিক ইতিহাসবিদরা এখন সাম্রাজ্য পতনের পেছনে মহামারি ও জলবায়ু পরিবর্তনকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। যেমন- অ্যাজটেক বা ইনকা সাম্রাজ্যের পতনে স্প্যানিশদের অস্ত্রের চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল ইউরোপ থেকে আসা গুটিবসন্তের জীবাণু। আবার রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সময় প্লেগের মহামারি (Plague of Justinian) কয়েক কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, যা তাদের শ্রমশক্তি ও সামরিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়। মায়ান সভ্যতার পতনের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে চলা খরাকে অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়।

​সাম্রাজ্যের পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী এক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল। যখন কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, যখন ন্যায়বিচারের চেয়ে দুর্নীতি বড় হয়ে ওঠে এবং যখন শাসকরা আত্মতুষ্টিতে ভোগেন, তখনই পতনের শুরু হয়। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজকের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যদি ইতিহাসের এই ভুলগুলো থেকে শিক্ষা না নেয়, তবে তাদের পরিণতিও হয়তো কোনো এক প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা নামহীন ইতিহাসের মতো হবে।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন