দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক আদেশের আলোকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করেছে, যা বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন গাইডলাইনে শারীরিক স্পর্শের গণ্ডি পেরিয়ে ইমেল, এসএমএস বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্যক্ত করা, ব্ল্যাকমেইল কিংবা প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি দেওয়াকেও এই প্রথম গুরুতর অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে।
এই গাইডলাইনটি শুধু কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্যই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেয়ে শিক্ষার্থী, নারী শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা দেবে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা দপ্তর ও সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের ভয়ের সংস্কৃতি দূর হবে এবং একটি নারীবান্ধব শিক্ষা প্রশাসন ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাউশির তৈরি প্রস্তাবিত গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী প্রধান পাঁচ সদস্যের বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন, ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার কঠোরতা এবং অপরাধীকে সাময়িক বরখাস্তের মতো কঠোর প্রশাসনিক বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত গাইডলাইনে যৌন হয়রানির সংজ্ঞাকে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে। শুধু শারীরিক স্পর্শই নয়, বরং ফোন, ইমেইল, এসএমএস বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর বার্তা পাঠানো, পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন এবং ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে ভিডিও ধারণ করাকেও যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য করা হবে।
গাইডলাইন অনুযায়ী, যৌন আবেদনমূলক উক্তি, শিস দেওয়া, অশালীন ভাষা বা মন্তব্যের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা, ফোন, এসএমএস, ই-মেইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি, কার্টুন বা বার্তা পাঠানো, চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে স্থির বা ভিডিওচিত্র ধারণ, সংরক্ষণ বা প্রচার করা, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা বা প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি প্রদান, যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাজি না হওয়ায় পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়া বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করাকেও অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গাইডলাইন মতে, যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা তদন্তে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পাঁচ সদস্যের একটি শক্তিশালী ‘অভিযোগ কমিটি’ গঠন করা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান স্থানে একটি ‘অভিযোগ বক্স’ স্থাপন করতে হবে।
গাইডলাইন অনুযায়ী, ভুক্তভোগী নিজে বা আইনজীবীর মাধ্যমে ঘটনার ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ (ফরম ‘ক’ অনুযায়ী) জমা দিতে পারবেন। তদন্তের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের পরিচয় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কঠোরভাবে গোপন রাখতে হবে। প্রয়োজনে তদন্তের সময়সীমা সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। অডিও-ভিজ্যুয়াল ডিভাইসের মাধ্যমে সাক্ষ্য রেকর্ড করা যাবে, তবে ভুক্তভোগীকে কোনো অপমানজনক প্রশ্ন করা যাবে না।
প্রস্তাবিত নির্দেশিকায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। গাইডলাইন অনুযায়ী, অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন এবং অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে (ছাত্র ব্যতিরেকে) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করবেন। অভিযুক্ত যদি শিক্ষার্থী হয়, তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তাকে নিয়মিত ক্লাস করা থেকে বিরত রাখা হবে।
যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। সকল সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলা বিধি অনুসারে, কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ প্রাপ্তির ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
গাইডলাইনে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রতি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষ সহকর্মীদের মধ্যে নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ বা কর্মসূচির আয়োজন করা, যৌন হয়রানির নেতিবাচক প্রভাব ও বিদ্যমান আইন সম্পর্কে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও সচেতনতা সভা আয়োজন করা এবং সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারসমূহ সহজ ভাষায় নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে রাখা।
এ ছাড়া তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ (নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ), ৯৯৯ (পুলিশি সহায়তা) এবং ১৬৪৩০ (আইনি সহায়তা) নম্বর ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।