মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে চিরবিদায় নিলেন আধুনিক ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী শাসক, দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। চলমান এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি তিনি তার কার্যালয়ে ভোরবেলায় কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর কেবল ইরান নয়, গোটা বিশ্বকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পাহলভী রাজতন্ত্রের স্বৈরশাসনের শিকড় উপড়ে ফেলে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত গড়া থেকে শুরু করে, পশ্চিমা বিশ্বের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইরানকে একটি অপ্রতিরোধ্য আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করার পেছনে তার জীবন ছিল এক অবিরাম সংগ্রামের মহাকাব্য। তার এই মহাপ্রয়াণ বিশ্ব ইতিহাসে একটি সুদীর্ঘ যুগের অবসান ঘটিয়েছে।
প্রারম্ভিক জীবন ও আদর্শিক চেতনার উন্মেষ
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের পবিত্র ও ঐতিহাসিক নগরী মাশহাদে এক রক্ষণশীল এবং গভীরভাবে ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলী হোসেইনি খামেনি। তার পিতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ জাওয়াদ খামেনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সম্মানিত আলেম।
শৈশব থেকেই আলী খামেনির জীবন আবর্তিত হয়েছে কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন এবং ইসলামী শিক্ষার আলোকে। মাশহাদের ঐতিহ্যবাহী মাদরাসায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর, উচ্চতর ধর্মীয় জ্ঞান অন্বেষণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে নিয়ে যায় ইরানের শিয়া শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু কোম নগরীতে। সেখানে তিনি তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ ও পণ্ডিতদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
এই কোম নগরীতেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁকটি আসে, যখন তিনি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মতো প্রথিতযশা ও বিপ্লবী নেতার সংস্পর্শে আসেন। খোমেনির আপসহীন রাজনৈতিক দর্শন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন তরুণ খামেনির চিন্তা ও মননে এক বিশাল বিপ্লবের বীজ বপন করে।
রাজতন্ত্রবিরোধী সংগ্রাম এবং নির্বাসিত জীবন
বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। রেজা শাহ পাহলভী এবং পরবর্তীতে তার পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর পশ্চিমাঘেঁষা, ধর্মনিরপেক্ষ এবং স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের মনে যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দানা বেঁধেছিল, আলী খামেনি ছিলেন তার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর। শাহের কুখ্যাত গুপ্তচর বাহিনী ‘সাভাক’-এর নির্মম নির্যাতন ও একাধিকবার কারাবরণ—কোনো কিছুই তাকে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন
১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবের সফলতার মধ্য দিয়ে পাহলভী রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ইরানে একটি নতুন সূর্যোদয় হয়। বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চরম সংকটময় মুহূর্তে আলী খামেনি নিজেকে বিলিয়ে দেন দেশের সেবায়। তিনি প্রথমদিকে ইসলামি রেভোলিউশনারি কাউন্সিলের একজন প্রভাবশালী সদস্য, পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী এবং তেহরানের জুমার নামাজের খতিব হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮১ সালের ২৭ জুন তার জীবনে ঘটে যায় এক ভয়াবহ প্রাণঘাতী হামলা। তেহরানের একটি মসজিদে বক্তব্য রাখার সময় তার সামনে রাখা একটি টেপ রেকর্ডারে লুকানো বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এই হামলায় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও তার ডান হাত চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং সেই বছরই তিনি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের সাথে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের (১৯৮০-১৯৮৮) সেই কঠিন সময়ে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ইরানকে খাদের কিনারা থেকে রক্ষা করেছিল।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে উত্থান ও ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি’
১৯৮৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মহানায়ক আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর, ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) আলী খামেনিকেই দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা বা ‘রাহবার’ হিসেবে নির্বাচিত করে। পরবর্তী সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অত্যন্ত শক্ত হাতে ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করেছেন। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার সুদীর্ঘ শাসনামলে ইরানকে চরম অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। পা
রমাণবিক কর্মসূচির কারণে পশ্চিমা বিশ্বের একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে তিনি ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি’ বা ‘রেজিস্ট্যান্স ইকোনমি’-এর তত্ত্ব প্রদান করেন। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটানোর এই নীতির কারণেই শত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা, ন্যানো টেকনোলজি ও সামরিক প্রযুক্তিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে খামেনি অত্যন্ত সাহিত্যমনা একজন মানুষ ছিলেন। ফার্সি ও আরবি সাহিত্যে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল এবং তিনি নিয়মিত কবি-সাহিত্যিকদের সাথে আড্ডায় মিলিত হয়ে দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশে ভূমিকা রাখতেন।
ভূ-রাজনীতি এবং রণাঙ্গনে চূড়ান্ত বিদায়
খামেনির পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন আধিপত্য দূর করা। তিনি ‘অ্যাক্সিস অব রেসিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষ গড়ে তোলার মাধ্যমে ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে সমগ্র অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বলয় অত্যন্ত সুদৃঢ় করেন। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের চাপ তাকে তার অনড় অবস্থান থেকে একচুলও সরাতে পারেনি।
জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। চলমান সামরিক সংঘাত যখন চরম আকার ধারণ করে, তখনও তিনি এক অকুতোভয় সেনাপতির মতোই সামনে থেকে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত এই রণাঙ্গনের তীব্র আঘাতেই তাকে প্রাণ হারাতে হলো। তার এই প্রয়াণ শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের বিদায় নয়, বরং একটি আদর্শিক স্তম্ভের পতন। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একজন অবিসংবাদিত চরিত্র হিসেবে তিনি যে প্রভাব রেখে গেলেন, তা আগামী বহু দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে যাবে।