বিশ্বের নজর এখন ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের গাজা উপত্যকায়। সংবাদপত্রের পাতা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- সবখানেই এই বড় যুদ্ধগুলোর আস্ফালন। কিন্তু ঠিক আমাদের পাশেই, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত মিয়ানমারে ঘটে চলেছে এক রক্তক্ষয়ী এবং ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। গত কয়েক দশক ধরে চলা এই সংঘাত ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এক নতুন ও চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। অথচ বিশ্বব্যাপী এই মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা যেন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসছে। এ কারণেই মিয়ানমারের এই লড়াইকে এখন অভিহিত করা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ‘ভুলে যাওয়া’ গৃহযুদ্ধ হিসেবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যুত্থানের আঘাত
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ একদিনের বা এক বছরের নয়। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম গৃহযুদ্ধগুলোর মধ্যে একটি। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই দেশটি জাতিগত দাঙ্গায় ক্ষতবিক্ষত। তবে ১০ বছরের একটি সংক্ষিপ্ত গণতান্ত্রিক পরীক্ষামূলক সময়ের পর, ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী বা ‘তাতমাদো’ আবারও ক্ষমতা দখল করে। সু চি-র নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের জান্তা সরকার সাধারণ মানুষের ওপর শুরু করে অবর্ণনীয় নির্যাতন। এর প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ কেবল রাজপথেই প্রতিবাদ জানায়নি, বরং তারা সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিয়েছে।
প্রতিরোধের নতুন বিন্যাস: পিডিএফ ও জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী
২০২১ সালের পরের পরিস্থিতি মিয়ানমারের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এর আগে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কেবল সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় ছিল। কিন্তু এখনকার ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস’ (PDF) গড়ে উঠেছে শহরের শিক্ষিত তরুণদের মাধ্যমে, যারা গণতন্ত্র ফেরাতে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। এছাড়া জান্তা বিরোধী ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্মেন্ট’ (NUG) এবং দীর্ঘদিনের জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো (EAO) এখন ঐক্যবদ্ধভাবে জান্তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সম্প্রতি ‘অপারেশন ১০২৭’-এর মাধ্যমে বিদ্রোহীরা জান্তা বাহিনীকে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা মিয়ানমারের মানচিত্রকে খণ্ডবিখণ্ড করে দিচ্ছে।
মানবিক বিপর্যয়: নীরব কান্না
এই যুদ্ধের মানবিক মূল্য অপরিসীম। জাতিসংঘের তথ্যমতে, মিয়ানমারে বর্তমানে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত। জান্তা সরকারের ‘ফোর কাটস’ নীতি (খাদ্য, অর্থ, গোয়েন্দা তথ্য এবং নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া) সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নির্বিচারে বিমান হামলা ও অগ্নিসংযোগের ফলে জনপদগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অথচ এই বিশাল সংখ্যক শরণার্থীর জন্য আন্তর্জাতিক ত্রাণের বরাদ্দ অন্যান্য যুদ্ধের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শরণার্থী শিবির বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থানরত ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন এই যুদ্ধের ফলে এখন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কেন এটি ‘ভুলে যাওয়া’ যুদ্ধ?
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ সংবাদ শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করছে কিছু ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা। প্রথমত, ইউক্রেন বা গাজার মতো এখানে কোনো বড় বৈশ্বিক শক্তির সরাসরি স্বার্থ (যেমন- তেল বা ভূ-কৌশলগত ব্লক) নেই। দ্বিতীয়ত, জান্তা সরকারকে রাশিয়া ও চীনের সমর্থন সংঘাতটিকে আন্তর্জাতিকভাবে সমাধানের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন ‘আসিয়ান’ (ASEAN) তাদের ‘ফাইভ পয়েন্ট কনসেনসাস’ বা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই উদাসীনতা জান্তা সরকারকে আরও বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাব
মিয়ানমারের এই অস্থিতিশীলতা কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। ভারতের মিজোরাম ও মণিপুর রাজ্যে মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীদের ভিড় জাতিগত উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে সীমান্ত দিয়ে মাঝে মাঝেই গোলাবারুদ এসে পড়ছে, যা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এছাড়া মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের মতো মাদকের চোরাচালান এই অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একটি অস্থির মিয়ানমার মানেই দক্ষিণ এশিয়ায় মাদকের রমরমা ব্যবসা এবং অস্ত্র চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য।
গণতন্ত্রের স্বপ্ন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
মিয়ানমারের বিদ্রোহীরা এখন আর কেবল পুরনো গণতন্ত্রে ফিরতে চায় না; তারা চায় একটি ‘ফেডারেল ডেমোক্রেসি’ যেখানে প্রতিটি জাতিসত্তার সমান অধিকার থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জান্তা সরকারের পতনের পর এই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী কি ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে আবারও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হবে? নাকি তারা একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারবে? তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, জান্তা সরকারের পরাজয় কেবল সময়ের ব্যাপার হতে পারে, যদি না আন্তর্জাতিক বিশ্ব আবারও মুখ ফিরিয়ে নেয়।
মিয়ানমার আজ এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। অথচ বিশ্ববিবেকের কাছে এই আগুনের তাপ কেন পৌঁছাচ্ছে না, তা এক বড় বিস্ময়। একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক এবং শান্ত মিয়ানমার কেবল দেশটির জনগণের জন্যই নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ আজ বনের লতাপাতা খেয়ে বা গুহায় লুকিয়ে জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তাদের এই আত্মত্যাগ যেন ইতিহাসের পাতায় কেবল ‘ভুলে যাওয়া’ অধ্যায় হিসেবে থেকে না যায়। বিশ্ব সম্প্রদায়কে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, নয়তো এই আঞ্চলিক ক্ষত একদিন পুরো এশিয়ার শান্তিকে গিলে খাবে।