আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে ‘রেজিম চেঞ্জ’ (Regime Change) বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন মার্কিন বৈদেশিক নীতির একটি অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত বিতর্কিত অংশ হিসেবে স্বীকৃত। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্র তার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা, গণতন্ত্রের প্রসার এবং কখনো কখনো মাদক ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বে সরাসরি আঘাত হেনেছে। এই হস্তক্ষেপের সবচেয়ে চরম রূপ দেখা যায় তখন, যখন সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় কিংবা তাদের আটক করে নিজ দেশে বা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য নিয়ে আসা হয়।
১. ম্যানুয়েল নোরিয়েগা (পানামা): গোয়েন্দা সহযোগী থেকে শত্রু
ম্যানুয়েল নোরিয়েগা ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত পানামার সামরিক শাসক ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র (CIA) অত্যন্ত বিশ্বস্ত এক সহযোগী। তিনি লাতিন আমেরিকায় সমাজতন্ত্রের প্রসার রুখতে এবং মাদক বিরোধী গোয়েন্দা তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতেন। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় যখন জানা যায় যে, নোরিয়েগা নিজেই বড় ধরনের মাদক কার্টেলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন এবং একই সঙ্গে কিউবার মতো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক রাখছেন। ১৯৮৮ সালে মার্কিন আদালত তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার এবং অর্থপাচারের অভিযোগ আনলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়।
১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ পানামায় ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ (Operation Just Cause) পরিচালনার নির্দেশ দেন। প্রায় ২৭,০০০ মার্কিন সেনা এই অভিযানে অংশ নেয়। অভিযানের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল পানামায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং নোরিয়েগাকে বিচারের আওতায় আনা। নোরিয়েগা ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নিলেও মার্কিন সেনাদের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে ৩ জানুয়ারি ১৯৯০ সালে আত্মসমর্পণ করেন।
তাকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিয়ে আসা হয়। ১৯৯২ সালে একটি মার্কিন আদালতে তার বিচার শুরু হয় এবং তাকে মাদক পাচারের দায়ে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসে প্রথম ঘটনা যেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে নিজ ভূখণ্ডে তুলে নিয়ে এসে বিচার করেছে।
২. সাদ্দাম হোসেন (ইরাক): পতন এবং শেষ পরিণতি
সাদ্দাম হোসেন ১৯৭৯ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরাকের শাসনক্ষমতায় ছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবন ছিল উত্থান-পতন এবং যুদ্ধে ভরপুর। প্রথম দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাকে সমর্থন দিলেও ১৯৯০ সালে কুয়েত দখলের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সাদ্দাম ক্ষমতায় টিকে থাকলেও ২০০৩ সালে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তার বিরুদ্ধে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ (WMD) তৈরির অভিযোগ আনেন। যদিও জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা এই দাবির সপক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ পায়নি, তবুও যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালের মার্চ মাসে ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’ শুরু করে।
এই অভিযানে মার্কিন এবং ব্রিটিশ বাহিনীর বিমান হামলায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাগদাদের পতন ঘটে। সাদ্দাম হোসেন আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ আট মাস ধরে ব্যাপক তল্লাশির পর ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিকরিতের কাছে একটি ছোট ভূগর্ভস্থ গর্ত থেকে তাকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী আটক করে। আটকের পর তাকে মার্কিন সামরিক হেফাজতে রাখা হয় এবং একটি অজ্ঞাত বন্দিশালায় দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ চলে। সাদ্দামকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকি সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হলেও তিনি মার্কিন নিবিড় নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই ছিলেন। ১৯৮২ সালের দুজাইল গণহত্যার দায়ে ইরাকি আদালতের রায়ে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার ফাঁসি কার্যকর হয়। সাদ্দামের এই পতন ও বন্দিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে আমূল পরিবর্তন আনে এবং ইরাককে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।
৩. স্লোবোদান মিলোশেভিচ (যুগোস্লাভিয়া): বলকান কসাইয়ের বিচার
স্লোবোদান মিলোশেভিচ ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তীতে ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যুগোস্লাভিয়া ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার উগ্র সার্ব জাতীয়তাবাদ নব্বইয়ের দশকে বলকান অঞ্চলে বসনিয়া ও কসোভোর মতো ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনা করে। বিশেষ করে কসোভোতে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানোর অভিযোগে ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর (NATO) মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী যুগোস্লাভিয়ার ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তাকে সরাসরি অভিযান চালিয়ে আটক করেনি, তবে মার্কিন চাপ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ মিলোশেভিচের পতনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।
২০০০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর মিলোশেভিচ ক্ষমতা হারান এবং ২০০১ সালের এপ্রিলে তাকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, মিলোশেভিচকে যদি নেদারল্যান্ডসের হেগ-এ অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICTY) হস্তান্তর না করা হয়, তবে দেশটিকে দেওয়া মার্কিন সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই চাপের মুখে সার্বিয়া সরকার তাকে হস্তান্তর করে।
মিলোশেভিচই ছিলেন প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান যাকে ক্ষমতায় থাকাকালীন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বিদেশের মাটিতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল। ২০০৬ সালে বিচারের রায় হওয়ার আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি হেগের বন্দিশালায় মৃত্যুবরণ করেন।
৪. মুয়াম্মার গাদ্দাফি (লিবিয়া): আরব বসন্ত ও ন্যাটোর হামলা
মুয়াম্মার গাদ্দাফি ১৯৬৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৪২ বছর লিবিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন। পশ্চিমাবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশূল ছিলেন। ২০১১ সালে ‘আরব বসন্তের’ প্রভাবে লিবিয়ায় গাদ্দাফি বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলে তিনি তা কঠোর হাতে দমনের চেষ্টা করেন। এই প্রেক্ষাপটে বেসামরিক জনগণের সুরক্ষার অজুহাতে জাতিসংঘ প্রস্তাবের মাধ্যমে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী লিবিয়ার আকাশে ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে এবং বিমান হামলা শুরু করে।
মার্কিন এবং ন্যাটোর বিমান হামলা গাদ্দাফির সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করে দেয়, যা বিদ্রোহীদের বিজয়ের পথ সুগম করে। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর গাদ্দাফি যখন তার জন্মভূমি সিরতে থেকে একটি গাড়িবহর নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন ন্যাটোর ড্রোন ও বিমান তার বহরে আক্রমণ চালায়। এই সামরিক হস্তক্ষেপের ফলেই গাদ্দাফি তার গাড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং একটি কালভার্টের নিচে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়েন। তাকে আটকের পর নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। যদিও মার্কিন সেনারা তাকে সরাসরি স্পর্শ করেনি, কিন্তু তাদের সামরিক প্রযুক্তি এবং আকাশপথে অভিযান ছাড়া গাদ্দাফির পতন বা মৃত্যু সম্ভব ছিল না। এই হস্তক্ষেপের ফলে লিবিয়া পরবর্তী সময়ে একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
৫. নিকোলাস মাদুরো (ভেনেজুয়েলা): লাতিন আমেরিকার রাজনীতির বিতর্কিত চরিত্র
নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সালে হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বাস ড্রাইভার থেকে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হওয়া মাদুরোর রাজনৈতিক জীবন ছিল বিস্ময়কর। একসময় হুগো শ্যাভেজের বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন, এরপর হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তিনি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন। তবে তার বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ ছিল। তার সময়ে ভেনেজুয়েলা চরম অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হয়, যার ফলে লাখ লাখ মানুষ দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে মূলত দুটি প্রধান অভিযোগ এনেছে: স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল এবং মাদক সন্ত্রাসবাদ।
২০১৯ সালে যখন মাদুরো দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিরোধী দলীয় নেতা গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০২০ সালে মার্কিন বিচার বিভাগ মাদুরো এবং তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক পাচারের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে। মাদুরোর মাথার ওপর ১৫ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মাদুরো একটি মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন যা কলম্বিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাঠায়। তাকে প্রথমে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ-অবরোধের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। কিন্তু তাতে তিনি হার না মানায় অবশেষে গত তিন জানুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্পেশাল ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’ অভিযান চালিয়ে তাকে আমেরিকায় নিয়ে আসে। শোনা যাচ্ছে, তাকে এখানে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক আইন এবং নৈতিকতার মানদণ্ডে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে একনায়কদের পতন সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি এনেছে, কিন্তু তার প্রক্রিয়াটি ছিল সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে নিজ ভূখণ্ডে তুলে নেওয়া, সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসি নিশ্চিত করা কিংবা মিলোশেভিচকে চাপের মুখে আন্তর্জাতিক আদালতে পাঠানো- এই প্রতিটি ঘটনাতেই মার্কিন একাধিপত্যের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তবে ইতিহাস বলছে, এই হস্তক্ষেপগুলোর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল সবসময় সুখকর হয়নি। লিবিয়া ও ইরাকের বর্তমান অস্থিরতা এবং হাইতির ক্রমাগত অস্থিতিশীলতা প্রমাণ করে যে, সামরিক শক্তি দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান পরিবর্তন করলেও একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা অনেক বেশি কঠিন কাজ।