Ridge Bangla

মাঘ: শীতের বিদায়বেলায় বসন্তের প্রস্তুতির মাস

বাংলা সনের দশম মাস মাঘ মানেই শীতের শেষ অধ্যায়। কুয়াশামাখা ভোর, শিশিরভেজা ঘাস আর নরম রোদের সকাল নিয়ে মাঘ আসে নিঃশব্দে, কিন্তু তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায় ঘরে ঘরে। মাঘ শুধু শীতের কনকনে ঠান্ডার প্রতীক নয়; এই মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক আয়োজন, ধর্মীয় আচার এবং বসন্তের আগমনী বার্তা। প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন রচনা করে এই মাস।

বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী পৌষ ও মাঘ- এই দুই মাস মিলেই শীতকাল। পৌষে শীত তার পূর্ণতা পায়, আর মাঘে এসে ধীরে ধীরে কোমল হতে শুরু করে। ভোরের কুয়াশা তখনো ঘন, তবে দুপুরের রোদে শীতের তীক্ষ্ণতা অনেকটাই ম্লান হয়ে আসে। গাছের পাতায় পাতায় শিশির ঝরে, কোথাও কোথাও শুরু হয় পাতাঝরা। প্রকৃতি যেন এক অদৃশ্য প্রস্তুতিতে ব্যস্ত- পুরনোকে ঝরিয়ে নতুনের পথে এগিয়ে যাওয়ার আয়োজন চলে নিঃশব্দে।

মাঘ নামের উৎস এসেছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি বিশেষ সময় থেকে। সূর্য যখন মঘা নক্ষত্রে অবস্থান করে, তখনই এই মাসের নামকরণ হয়েছে মাঘ। এই সময় সূর্য উত্তরায়ণের পথে থাকে, যা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মে মাঘ মাসকে বলা হয় সংযম, স্নান ও সাধনার মাস। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়ে গঙ্গা বা পবিত্র নদীতে স্নান করলে পাপমোচন হয় এবং পুণ্য লাভ করা যায়। গ্রামবাংলায় এখনো মাঘ মাসজুড়ে নানা ব্রত ও উপবাস পালনের রীতি প্রচলিত।

হিন্দু সমাজে মাঘ মাসে সূর্যব্রত পালনের চল রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বিশেষ করে অবিবাহিত নারীরা এই ব্রত পালন করলে তাদের জীবনে সুখ ও কাঙ্ক্ষিত জীবনসঙ্গী আসতে পারে। যদিও আধুনিক জীবনে এসব বিশ্বাসের প্রভাব কিছুটা কমেছে, তবুও গ্রামবাংলায় মাঘের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এসব আচার এখনো সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে আছে।

মাঘ মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো মাঘী পূর্ণিমা। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই দিনটির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। বুদ্ধের জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মরণে এই দিনে নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, প্রার্থনা ও দানের আয়োজন করা হয়। দেশের বৌদ্ধ বিহারগুলোতে মাঘী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় আলোচনা, প্রার্থনা সভা এবং সামাজিক কার্যক্রম চলে। এই দিনটি শুধু ধর্মীয় নয়, মানবিক মূল্যবোধের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

মাঘ মাস মানেই বাঙালির জীবনে উৎসবের আবহ। মাসের শুরুতেই পুরান ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন বা ঘুড়ি উৎসব। ছাদের পর ছাদ, আকাশজুড়ে রঙিন ঘুড়ির মেলা- শীতের নীল আকাশ যেন হয়ে ওঠে আনন্দের ক্যানভাস। পুরান ঢাকার এই উৎসব শতাব্দীপ্রাচীন সংস্কৃতির অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বাইরেও এই উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করাও ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দে মেতে ওঠেন। সাকরাইন কেবল বিনোদনের উৎসব নয়; এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও নগর সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক।

মাঘ মাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজন হলো সরস্বতী পূজা। মাঘের শুক্লা পঞ্চমীতে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনায় মুখর হয়ে ওঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। বই-খাতা, কলম সাজিয়ে পূজার আয়োজন করা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের মধ্যে থাকে আলাদা এক উচ্ছ্বাস।

মাঘ মানেই পিঠা-পুলির মৌসুমের শেষ বড় আয়োজন। শীতের শুরু থেকেই গ্রামবাংলায় চালের গুঁড়ো, খেজুরের গুড় আর নারকেলের নানা রকম পিঠা তৈরি হয়। মাঘে এসে সেই উৎসব যেন চূড়ান্ত রূপ পায়। ভাপা, পাটিসাপটা, দুধপুলি, চিতই- এসব পিঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক আড্ডা আর সামাজিক বন্ধন। শহরেও এখন নানা পিঠা উৎসবের আয়োজন দেখা যায়, যা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরছে।

কৃষিজীবনেও মাঘ মাসের গুরুত্ব আলাদা। শীতকালীন ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি চলে এই সময়ে। সরিষার হলুদ ফুলে মাঠ রঙিন হয়ে ওঠে, যা বাংলার প্রকৃতিতে এক অনন্য সৌন্দর্য যোগ করে। কৃষকের চোখে মাঘ মানে আশার মাস- ফসলের ফলন কেমন হলো, তার হিসাব-নিকাশ শুরু হয় এই সময় থেকেই।

সবচেয়ে বড় কথা, মাঘ হলো বসন্তের প্রস্তুতির মাস। প্রকৃতি শীতের রুক্ষতা ঝেড়ে ফেলে ধীরে ধীরে রঙিন হতে শুরু করে। গাছের ডালে নতুন কুঁড়ির আভাস দেখা যায়, বাতাসে থাকে এক ধরনের নরম উষ্ণতা। মানুষের মনেও তখন পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। শীতের গুটিয়ে থাকা জীবনধারা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ প্রস্তুত হয় নতুন ঋতুকে বরণ করার জন্য।

মাঘ যেন প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে একটি বার্তা বয়ে আনে- বিদায়ের মাঝেই লুকিয়ে থাকে আগমনের ইঙ্গিত। শীত বিদায় নিতে নিতে দিয়ে যায় উৎসব, আচার আর স্মৃতির রেশ। আর সেই রেশ ধরেই আসে বসন্ত, নতুন প্রাণ আর নতুন সম্ভাবনার ঋতু। বাংলার সংস্কৃতিতে তাই মাঘ কেবল একটি মাস নয়; এটি সময়ের এক বিশেষ বাঁক, যেখানে প্রকৃতি, ধর্ম, উৎসব আর মানুষের জীবন এক সুতোয় গাঁথা। শীতের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মাঘ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- পরিবর্তন অনিবার্য, আর প্রতিটি শেষই নতুন শুরুর পথে একটি প্রয়োজনীয় ধাপ।

This post was viewed: 6

আরো পড়ুন