গত বছরের জুন মাসেই ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘাত প্রত্যক্ষ করেছে গোটা বিশ্ব। এই দুই দেশের মহারণে শেষ পর্যন্ত যুক্ত হয়েছিল ইসরায়েলের ‘সবচেয়ে বড় মিত্র’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যেটি আসলে বেশ প্রত্যাশিত ছিল। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির মাঝে দীর্ঘদিন ধরে শীতল যুদ্ধ চলে আসলেও গত জুন মাসের ‘বারো দিনের যুদ্ধ’ ছিল দুই দেশের সামরিক শক্তির নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। সেটির রেশ পুরোপুরি চলে না যেতেই গতকাল ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে তা এক ভয়ংকর ও সরাসরি যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। শনিবার ভোরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিসরে সামরিক হামলা চালায়।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের ভাষায় এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury)। অপরদিকে ইসরায়েল এর নাম দিয়েছে ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’ (Operation Roaring Lion)। আবার এই হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোনের বিশাল বহর নিয়ে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ভয়াবহ পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলা ছিল ছিল অত্যন্ত ধীরগতির। দেখে মনে হচ্ছিল প্রতিশোধের জন্য নয়, বরং জনগণের চাপের কারণে একপ্রকার বাধ্য হয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে আয়াতুল্লাহ খোমেনির সামরিক বাহিনী। কিন্তু এবার ইরানের এই তড়িৎ গতির পাল্টা হামলা ছিল বেশ অবাক করার মতো ব্যাপার। ইসরায়েল ও আমেরিকার এই আগাম হামলা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকেই ধ্বংস করেনি, বরং পুরো বিশ্বকে একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।
সংঘাতের প্রস্তুতি: কূটনীতির ব্যর্থতা ও সামরিক সমরসজ্জা
২৮শে ফেব্রুয়ারির এই হামলা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এর পেছনে ছিল কয়েক সপ্তাহের ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার ইতিহাস। গত কয়েক মাস ধরেই ইরান এবং পশ্চিমাদের মধ্যে ওমান ও সুইজারল্যান্ডে যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল, তা মূলত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে শুরু করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে পারস্য উপসাগর ও এর আশপাশের অঞ্চলে ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’ (USS Gerald R. Ford)-এর মতো একাধিক এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার, ডেস্ট্রয়ার এবং প্রায় ১০,০০০ অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। ইসরায়েলও তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমানবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় নিয়ে যায়। এই বিশাল সামরিক সমরসজ্জা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত ও সুপরিকল্পিত আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২৮শে ফেব্রুয়ারির যৌথ হামলা: লক্ষ্য ও পরিণতি
শনিবার ভোরে ইসরায়েলি ফাইটার জেট এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া টোমাহক ক্রুজ মিসাইল ও হিমার্স (HIMARS) রকেট একযোগে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। তেহরান, ইস্পাহান, ক্বোম, কারাজ এবং কেরমানশাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। এই হামলার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকটি ছিল ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সুরক্ষিত বাসভবন ও কার্যালয়ে সরাসরি আক্রমণ। ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে লক্ষ্য করে এই ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ (শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার কৌশল) চালানো হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ভিডিও বার্তায় এই আক্রমণকে ‘বড় ধরনের যুদ্ধাভিযান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি সরাসরি ইরানের জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার এবং সরকার পতনের এটাই আপনাদের সেরা সুযোগ।” অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এই হামলাকে ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একটি ‘প্রিএম্পটিভ স্ট্রাইক’ বা আগাম সতর্কতামূলক হামলা বলে দাবি করেন। তবে এই যৌথ হামলার মানবিক মূল্যও ছিল ভয়ংকর। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলার ধ্বংসাবশেষ পড়ে অন্তত ৫৭ জন নিহত হওয়াসহ দেশজুড়ে দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরানের তাৎক্ষণিক পাল্টা আক্রমণ: অ্যাসাইমেট্রিক ওয়ারফেয়ারের ভয়াল রূপ
আমেরিকা ও ইসরায়েল হয়তো আশা করেছিল তাদের এই ব্যাপক হামলার পর ইরানের কমান্ড স্ট্রাকচার ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান তাদের পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। শুধু ইসরায়েল নয়, ইরান তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু বানায় জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে।
বিশেষ করে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর (5th Fleet HQ) এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে ইরানের এই হামলা প্রমাণ করে যে, তারা সংঘাতের পরিধি পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।
ইরানের এই পাল্টা আক্রমণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘অ্যাসাইমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ (Asymmetric Warfare) বা অসম যুদ্ধের যে ধারণা রয়েছে, তার একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। সামরিক বাজেটে পিছিয়ে থাকলেও, ইরান প্রমাণ করেছে যে তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন স্বার্থে মারাত্মক আঘাত হানতে সক্ষম। ইরান যদি পুরোপুরি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়, তবে তার অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক মিসাইলের ভান্ডারকে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি করার মতো সামর্থ্য রয়েছে তার। অপরদিকে হরমুজ প্রণালি যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য বড় ধাক্কা খেতে পারে।
প্রিএম্পটিভ স্ট্রাইক (Preemptive Strike) এবং ইসরায়েলের ‘বিগিন ডকট্রিন’
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্টভাবে এই হামলাকে একটি ‘প্রিএম্পটিভ’ অপারেশন বলেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি অনুযায়ী, যখন কোনো রাষ্ট্র মনে করে যে তার অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি (যেমন- পারমাণবিক অস্ত্র) তৈরি হচ্ছে, তখন সে আত্মরক্ষার্থে আগেই আক্রমণ করে বসে। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এটি ‘বিগিন ডকট্রিন’ (Begin Doctrine) নামে পরিচিত। ১৯৮১ সালে ইরাকে এবং ২০০৭ সালে সিরিয়ায় পারমাণবিক চুল্লিতে হামলার মতো, ২৮শে ফেব্রুয়ারির এই হামলাটিও ছিল ইরানের পারমাণবিক ও মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য বিগিন ডকট্রিনের চূড়ান্ত প্রয়োগ।
রেজিম চেঞ্জ (Regime Change) এবং হেজিমোনিক স্ট্যাবিলিটি থিওরি
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভিডিও বার্তা এবং মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণের ধরন স্পষ্ট করে যে, এই হামলার মূল লক্ষ্য শুধু ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো নয়, বরং ‘রেজাইম চেঞ্জ’ বা শাসনক্ষমতার পরিবর্তন। ‘অফেনসিভ রিয়ালিজম’ (Offensive Realism) বা আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ তত্ত্ব অনুযায়ী, পরাশক্তিগুলো তাদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বদা আঞ্চলিক আধিপত্য (Hegemony) বজায় রাখতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ‘হেজিমোনিক স্ট্যাবিলিটি’ বা মোড়লগিরির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ইরান। ‘শিয়া’ ইরানের সামরিক অগ্রগতিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদেশগুলো তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করে। তাই, ইরানের বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করে সেখানে একটি মার্কিনপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠার বাসনা থেকেই এই ব্যাপক মাত্রার সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।
নিবারণ তত্ত্বের (Deterrence Theory) চূড়ান্ত পতন
স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় ‘ডেটারেন্স’ বা নিবারণ তত্ত্ব একটি বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। এর মূল কথা হলো- শত্রুর মনে বিশাল পাল্টা আক্রমণের ভয় ঢুকিয়ে তাকে নিবৃত্ত রাখা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল তাদের বিশাল নৌবহর এবং সামরিক সমরসজ্জা ইরানকে ভয় পাইয়ে দেবে। অপরদিকে, ইরান ভেবেছিল তাদের বিপুল মিসাইল ভাণ্ডার এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানার সক্ষমতা আমেরিকাকে সরাসরি হামলা থেকে বিরত রাখবে। ২৮শে ফেব্রুয়ারির ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই ডেটারেন্স বা নিবারণ তত্ত্ব চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। উভয় পক্ষের ভুল হিসাব-নিকাশ ডেটারেন্সের পতন ঘটিয়ে সরাসরি যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে।
বৈশ্বিক প্রভাব
২৮শে ফেব্রুয়ারির মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে একটি নতুন ও অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি এখন আর কোনো প্রক্সি যুদ্ধ বা বিচ্ছিন্ন হামলা নয়, বরং সরাসরি রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বের লড়াই। এই হামলার ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো (যেমন- বাহরাইন, কাতার, কুয়েত) চরম সংকটে পড়েছে, কারণ তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন সরাসরি ইরানের লক্ষ্যবস্তু।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইতোমধ্যে জরুরি বৈঠকে বসেছে, কিন্তু পরাশক্তিগুলোর ভেটো ক্ষমতার কারণে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ চরমভাবে বিঘ্নিত হবে, যার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ধস নামবে। ২৮শে ফেব্রুয়ারির এই ঘটনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকেই হয়তো বদলে দেবে না, বরং একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। কূটনীতি যদি এখনই এই সংঘাতের লাগাম টেনে ধরতে না পারে, তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি হয়তো আর খুব বেশি দূরে নয়।