পৃথিবীর নানা স্থানে অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি দেখা যায়। এসব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নির্দিষ্ট অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয়। খাবার-দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ, চালচলনসহ নানা ক্ষেত্রেই অঞ্চলভেদে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। ইতালির ভেনিসে গন্ডোলা, থাইল্যান্ডের রাস্তায় বাহারি রঙের টুকটুক, লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ডাবল ডেকার বাস- এসবই একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থা।
পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলাদেশেও রয়েছে জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থা রিকশা। যুগ যুগ ধরে এই রিকশা দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে, যা এখন পরিণত হয়েছে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে।
কোনো নগর বা মহানগরে অল্প দূরত্ব অতিক্রম করার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থাগুলো যাতায়াতকে সহজ করে। তবে এই পরিবহন ব্যবস্থাকে যদি কোনো নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে আনা সম্ভব না হয়, তাহলে সেটাই হয়ে উঠতে পারে চরম ভোগান্তির কারণ, সৃষ্টি করতে পারে তীব্র যানজট। যেমনটা এখন আমরা দেখছি বাংলাদেশের সব নগর ও মহানগরে।
দেশের প্রতিটি উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে রাজধানীতেও দেখা যাচ্ছে তীব্র যানজট। এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ আমাদের দেশের জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থা রিকশার কোনো প্রকার পরিকল্পনা ছাড়াই অটোরিকশায় পরিণত হওয়া। ঢাকা “রিকশার নগরী” হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও এখন সেটাই যেন হয়ে উঠেছে নগরবাসীর গলার কাঁটা।
ঢাকার যানজট নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ের মতো আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হলেও সড়ক-মহাসড়কের সংযোগস্থল, প্রবেশপথ ও অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলো এখনও পুরোদমে রিকশাসহ বিভিন্ন তিন চাকার যানের দখলে। লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলে ইলেকট্রিক চার্জিংয়ে।
বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে বর্তমান তেল সংকটে বাড়তি চাপের পেছনে এসব অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার দায় রয়েছে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া এসব গাড়ির লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকরা শহরের যানজট বৃদ্ধি, দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত।
নগর জীবনে অটোরিকশার দৌরাত্ম্য নিয়ে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতে গেলে কথা হয় কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে একজন বেসরকারি একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, যিনি ঢাকার নীলক্ষেত থেকে বই কিনে হাজারীবাগে ফিরছিলেন। তিনি জানান, শিক্ষা সংক্রান্ত নানা কাজে তাঁকে প্রায়শই নীলক্ষেতে আসতে হয়। এই পথে নীলক্ষেত থেকে শুরু করে ঝিগাতলা হয়ে হাজারীবাগ পর্যন্ত পুরো রাস্তা সব সময় যানজটে থমকে থাকে। আর এই যানজটের প্রধান কারণ অটোরিকশা। রাস্তায় বাস, প্রাইভেটকার, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, সাইকেল ও মোটরসাইকেলের সমন্বিত উপস্থিতির চেয়েও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার উপস্থিতি কয়েক গুণ বেশি। সড়ক যেন পুরোটাই এখন বাহারি রঙের অটোরিকশায় ছেয়ে গেছে। তাঁর কথার বাস্তব চিত্র দেখা গেছে সড়কে ঘুরে। অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিতভাবে অটোরিকশা বাড়ার ফলে মফস্বল শহর থেকে শুরু করে ঢাকার অলিগলিও এখন যানজটে স্থবির।
বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাস্তা বন্ধ না করে ভিআইপি প্রটোকল ছাড়াই যানজটের মধ্যে আটকে থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তিনি নিজেই যানজটে বসে থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার জটলা তাঁর গাড়ির সামনে-পেছনে দেখছেন। কিন্তু তিনি কেন এ বিষয়টি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না, এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এটার তো একটা সমাধান দরকার। তা না হলে মানুষ বিরক্ত হয়ে প্রশংসার বদলে একদিন তাঁর সমালোচনাও করবে। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এই কাজ করে প্রশংসা কুড়ালেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটা আমাদের সড়ক ব্যবস্থার নাজেহাল অবস্থাকেই তুলে ধরছে। কোনো একজন বিদেশি পর্যটক বা কূটনৈতিক মিশনের কর্মী দেশে প্রবেশ করে বিমানবন্দর ত্যাগের পর সর্বপ্রথম যা অবলোকন করেন, তা হচ্ছে রাস্তায় সারি সারি যানবাহন জ্যামে স্থবির হয়ে আছে। আর এসবের বেশিরভাগই এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা।
রাস্তার যত্রতত্র থামানো, হঠাৎ করেই চলন্ত রাস্তার ওপর ইউটার্ন নেওয়া, কোনো প্রকার ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করা, হুটহাট করেই উল্টো রাস্তায় ঢুকে যাওয়া, বেপরোয়া ড্রাইভিং- এসব যেন হয়ে উঠেছে একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকের নিত্যদিনের রুটিন। তাদের যত্রতত্র রিকশা থামিয়ে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতায় সকাল-সন্ধ্যা সড়কে জ্যাম লেগেই থাকছে।
এই বিষয়ে চাক্ষুষ প্রমাণ মেলে দেশের অন্যতম অভিজাত এলাকা ধানমণ্ডির ঝিগাতলায় গেলে। সকালবেলা অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে ধানমণ্ডি গিয়েই লম্বা এক জ্যামে আটকে যাওয়ার পর খবর নিয়ে দেখা যায়, উল্টো রাস্তায় দুটি ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢুকে পড়ায় রজনীগন্ধা পরিবহনের একটি বাস সামনের দিকে এগোতে পারছে না। তাতেই এই চওড়া রাস্তাতেও সৃষ্টি হয়েছে যানবাহনের লম্বা সারি।
ব্যাটারিচালিত রিকশার এহেন কার্যকলাপে দেখা দিচ্ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি, যা প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছে দুর্ঘটনা। এই ধরনের রিকশাগুলোর মূল কাঠামো প্যাডেল রিকশার মতো হলেও এতে উচ্চ ক্ষমতার মোটর ব্যবহার করা হয়। ফলে এটি অনিয়ন্ত্রিত গতিতে চলতে পারে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এর ব্রেকিং সিস্টেম বা সামগ্রিক ভারসাম্য গতির তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল, যা খুব অল্প সময়ে এই যানটিকে দ্রুতগতিতে ছুটতে সাহায্য করলেও ব্রেক করার সময় বা দ্রুতগতিতে চলাকালীন অবস্থায় রাস্তার উঁচু-নিচু স্থানে ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে গিয়ে হরহামেশাই পড়ছে দুর্ঘটনার মুখে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে ৮৭০টি দুর্ঘটনায় ৮৭৫ জন নিহত এবং ১ হাজার ৭৭৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়াও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি অন্য এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ঈদকালীন ভিড়ে ঢাকায় ঘটা ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৫ শতাংশই ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে জড়িত ছিল।
ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু যে রাস্তায় জ্যাম সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত থাকছে, বিষয়টি এমন নয়। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয়ের হুমকিও। বেশিরভাগ অটোরিকশায় সস্তা লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। এই ব্যাটারিগুলোর সঠিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা নেই। ফলে এ থেকে নির্গত সীসা মাটি ও পানির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৩ দশমিক ৫ কোটি শিশু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে সীসা দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে।
অটোরিকশার এমন দৌরাত্ম্যে মানুষের নগরজীবন হয়ে উঠেছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, যানজটের বিষয়ে ৬২ শতাংশ মানুষ ব্যাটারিচালিত রিকশাকে দায়ী করেছেন। তারা বলছেন, অটোরিকশা চালকরা রাস্তার জেব্রা ক্রসিং পর্যন্ত দখল করে নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।