ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার মিত্র দলগুলো। এ বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি দুই দশক পর ফের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরল। পাশাপাশি দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান, যা দেশের রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের যাত্রালগ্নে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাটাই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয় হবে।
সাধারণ নাগরিকরা নতুন সরকার ও মন্ত্রিপরিষদের কাছে তাদের প্রত্যাশার কথা প্রকাশ করেছেন। তারা দেশের মানুষকে সুখী, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে চাইছেন। বিশেষত চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম দূর করতে সরকারের ওপর জনগণের নজর থাকবে। জনগণ আশা করছেন, নতুন সরকারের হাতে মৌলিক অধিকার রক্ষিত থাকবে, দুর্নীতিমুক্ত শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সৎ ও সহনশীল বিচারিক ব্যবস্থা কার্যকর হবে। এছাড়া অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ক্ষয়িষ্ণু ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেও সরকারের চ্যালেঞ্জ থাকবে। অতীত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি, সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণপরিষদ ও উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি- এসব কাজও সরকারের দায়িত্বে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারকে শুধু পরিচালনাই নয়, বরং গণমানুষের কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রায়হান আহমেদ বলেন, “নতুন মন্ত্রিপরিষদের কাছে আমাদের একটাই চাওয়া- নতুন বাংলাদেশ যেন চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত হয়। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে।” বেসরকারি চাকরিজীবী পারভেজ হুসাইন বলেন, “দেশ যেন সুন্দরভাবে চলতে পারে, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ও পে-স্কেল বাস্তবায়ন নতুন সরকারের প্রধান প্রত্যাশা।” স্কুল শিক্ষক শাহীন আক্তার বলেন, “এই নতুন সরকারের কাছে আমাদের আশা, ঋণে জর্জরিত দেশ যেন সত্যিকারের জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়। আমরা চাই দুর্নীতিমুক্ত ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে উঠুক।”
বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, “সরকার যেন অর্থ পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় এবং দেশের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।” নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’-এর সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, “সাধারণ মানুষ চাইছে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হোক। কর্মসংস্থান বৃদ্ধিও বড় চ্যালেঞ্জ।” বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, “গুজব ও ভুল তথ্য নতুন সরকারের বড় প্রতিবন্ধকতা হতে পারে। তাই সঠিক তথ্য সরবরাহে সতর্কতা জরুরি। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।”
নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, “নতুন মন্ত্রিসভা বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সফল হোক, এটাই প্রত্যাশা। জ্বালানি খাতের অস্থিরতা মোকাবিলার জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, “মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সরকারকে তা দ্রুত মোকাবিলা করতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাতে সরকার জনগণের সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং ফলশ্রুতিতে জনপ্রিয়তা বজায় থাকবে। অত্যধিক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারের সামনে শুধুমাত্র প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোতে গুণগত পরিবর্তন আনার দায়িত্ব রয়েছে। মানুষের কল্যাণ, স্বচ্ছ শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা- এসব বিষয় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই নতুন সরকারের মূল পরীক্ষা।