Ridge Bangla

পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এক স্বপ্নের ঠিকানা নিউজিল্যান্ড

পৃথিবীর মানচিত্রে যাকে অনেকেই ‘শেষ প্রান্ত’ বলে মনে করেন, সেই দূর দক্ষিণে অবস্থিত নিউজিল্যান্ড। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা এই দ্বীপরাষ্ট্র যেন কোলাহলমুখর আধুনিক পৃথিবীর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক শান্ত আশ্রয়। যেখানে সূর্য ওঠে আলাদা আলো নিয়ে, বাতাসে ভেসে থাকে নীরবতার গান, আর প্রকৃতি নিজস্ব ছন্দে কথা বলে। তাই নিউজিল্যান্ডকে অনেকেই ডাকেন ‘The Land of the Long White Cloud’ বলে। আবার কারও কাছে এটি স্বপ্নের দেশ, বিকল্প জীবনধারার প্রতীক।

নিউজিল্যান্ড মূলত দুটি প্রধান দ্বীপ- নর্থ আইল্যান্ড ও সাউথ আইল্যান্ড, এবং অসংখ্য ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত। দেশটির মোট আয়তন প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার, যা বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ। অথচ লোকসংখ্যা মাত্র ৫০ লাখের কিছু বেশি। জনসংখ্যা কম হওয়ায় এখানকার প্রকৃতি আজও অনেকটাই অবিকৃত, দূষণমুক্ত এবং প্রশান্ত। দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত হওয়ায় এখানে ঋতুচক্রও ভিন্ন। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে যখন উত্তর গোলার্ধে শীত, তখন নিউজিল্যান্ডে গ্রীষ্ম। এই ভৌগোলিক বৈচিত্র্যই দেশটিকে দিয়েছে অনন্য প্রাকৃতিক চরিত্র।

নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রকৃতি। বরফে ঢাকা দক্ষিণ আল্পস পর্বতমালা, সবুজ উপত্যকা, গভীর নীল হ্রদ, অজস্র জলপ্রপাত আর দীর্ঘ সমুদ্রতট- সব মিলিয়ে দেশটি যেন প্রকৃতির এক বিশাল শিল্পকর্ম। বিশ্বখ্যাত ফিয়র্ডল্যান্ড ন্যাশনাল পার্ক, মিলফোর্ড সাউন্ডের পাথুরে পাহাড় ও কুয়াশামাখা জলরাশি, লেক টেকাপোর স্বচ্ছ নীল জল- এসব দৃশ্য চোখে পড়লে অনেকেরই মনে হয় যেন কোনো সিনেমার সেটে দাঁড়িয়ে আছেন। বাস্তবেও হলিউডের বিখ্যাত লর্ড অব দ্য রিংস চলচ্চিত্রের বড় অংশের শুটিং হয়েছে এই নিউজিল্যান্ডেই। এখানে প্রকৃতি শুধু দেখার বিষয় নয়, জীবনের অংশ। পাহাড়ে হাইকিং, হ্রদে কায়াকিং, সমুদ্রে সার্ফিং- সবকিছুই দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে আছে।

নিউজিল্যান্ডের অর্থনীতি খুব বড় বা চমকপ্রদ না হলেও অত্যন্ত স্থিতিশীল। কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যই এ দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। বিশ্বের অন্যতম বড় দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানিকারক দেশ নিউজিল্যান্ড। পাশাপাশি মাংস, উল ও কৃষিপণ্য রপ্তানিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া পর্যটন খাত দেশটির অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক নিউজিল্যান্ডে ভিড় করেন তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নিরাপদ পরিবেশের টানে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতও ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান। বিশ্বব্যাপী সূচকে নিউজিল্যান্ড নিয়মিতভাবেই বসবাসযোগ্য দেশের তালিকায় শীর্ষে থাকে। কাজের পরিবেশে চাপ তুলনামূলক কম, সামাজিক নিরাপত্তা শক্তিশালী এবং জীবন–কাজের ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।

নিউজিল্যান্ডের সংস্কৃতি আধুনিকতা আর আদিবাসী ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন। এ দেশের আদি বাসিন্দা মাওরি জনগোষ্ঠী। তাদের ভাষা, শিল্পকলা, বিশ্বাস ও জীবনদর্শন আজও জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাওরিদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ‘হাকা’ এখন বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এটি শুধু নাচ নয়- এটি সাহস, শক্তি, ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নিউজিল্যান্ডের দল মাঠে নামার আগে হাকা পরিবেশন করে নিজেদের ঐতিহ্য ও মানসিক দৃঢ়তার জানান দেয়। ইউরোপীয় অভিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে মাওরি ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে নিউজিল্যান্ড গড়ে তুলেছে এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়। এখানে ভিন্ন মত ও ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো সামাজিকভাবে স্বীকৃত মূল্যবোধ।

নিউজিল্যান্ডের মানুষ সাধারণত শান্ত, বন্ধুবৎসল ও প্রকৃতিপ্রেমী। এখানে প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু তা জীবনের সবকিছু নয়। সময়মতো কাজ শেষ করে পরিবার, বন্ধু আর প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোকে মানুষ বড় সম্পদ বলে মনে করে। শহর ও গ্রামের ব্যবধান তুলনামূলক কম। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মানুষের জীবনযাপন অনেকটাই ধীর, স্বাভাবিক ও মানবিক। তাই অনেক অভিবাসী নিউজিল্যান্ডকে বেছে নেন ‘স্ট্রেসমুক্ত জীবন’-এর আশায়।

নিউজিল্যান্ডকে স্বপ্নের দেশ বলা হয় শুধু তার সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং তার জীবনদর্শনের জন্য। এখানে প্রকৃতি কথা বলে, মানুষ ধীরে বাঁচে, আর জীবনের সাফল্য শুধু দৌড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিউজিল্যান্ড যেন নীরবে একটি বার্তা দেয়- জীবনকে একটু ধীরে উপভোগ করো, প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলো, আর স্বপ্ন দেখতে কখনো ভয় পেয়ো না।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন