Ridge Bangla

পাহাড়ে অপরাধের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুর

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নে বিশাল জায়গাজুড়ে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। সরকারি খাসজমি হওয়ায় এলাকাটিতে কারাগার, আইটি পার্ক নির্মাণসহ ১১টি প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে নির্মাণের সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে জানা যায়, নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোর জমি উদ্ধারে ব্যর্থতাই এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ।

জানা গেছে, গত চার দশক ধরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাহাড় কেটে জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি। এখনো পাহাড় কেটে প্রতিনিয়ত চলছে প্লট বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোই সেখানে সর্বক্ষণ সশস্ত্র পাহারা দেয়। তাদের জন্যই সরকারি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য জমি পুনরুদ্ধার করতে পারছে না প্রশাসন। বিভিন্ন সময়ে জঙ্গল সলিমপুরে জমি উদ্ধারসহ নানা কারণে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জেলা প্রশাসনের লোকজন গুরুতর হামলার শিকার হয়েছেন।

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাসের হাত ধরে এই এলাকায় পাহাড় কাটার মহোৎসব শুরু হয়। সরকারি খাসজমি দখল করে সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে প্লট বিক্রির এক রমরমা বাণিজ্য গড়ে তোলেন তিনি। আক্কাস র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে তাঁর রেখে যাওয়া সাম্রাজ্য কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আক্কাসের পর তার সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার গাজী সাদেক ভিন্ন ভিন্ন সন্ত্রাসী দল তৈরি করেন।

এই সন্ত্রাসীরাই জঙ্গল সলিমপুর এলাকার প্রবেশমুখে তৈরি করেছে লোহার গেট, বসিয়েছে পাহারা। বসবাসরত বাসিন্দাদের জন্য চালু করেছে আলাদা পরিচয়পত্র। এই পরিচয়পত্র ছাড়া বাইরের কেউ এলাকায় প্রবেশ করতে পারে না। পানি, গ্যাস, বিদ্যুতের কথা বলে বাসিন্দাদের কাছ থেকে আদায় করা হয় লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা। জঙ্গল সলিমপুর থেকেই সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চলের যাবতীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুর হয়ে উঠেছে দেশের ভেতরে আরেকটি দেশ। নিজস্ব আইন-কানুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে এলাকাটি যেন দেশের অভ্যন্তরেই একটি বিচ্ছিন্ন রাজ্য হয়ে উঠেছে।

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজীদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোড। এর উত্তর পাশে হাজার ১০০ একরের বিশাল জায়গাজুড়ে অপরাধরাজ্য জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। এলাকাটি প্রশাসনিকভাবে সীতাকুণ্ডের অংশ হলেও এর কৌশলগত অবস্থান চট্টগ্রাম মহানগরীর ঠিক ভেতরেই। পূর্বে হাটহাজারী আর দক্ষিণে বায়েজীদ থানার সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় এলাকাটি অপরাধীদের জন্য এক নিরাপদ দুর্গে পরিণত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, জঙ্গল সলিমপুর যার দখলে, নগরীর অপরাধ সাম্রাজ্যও তার হাতে। মূলত আধিপত্যের এই মরণপণ লড়াই অপরাধজগতের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার নেশাই জঙ্গল সলিমপুরকে বারবার অস্থিতিশীল করে তুলছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, লিংক রোডের আশপাশের এলাকার প্রতি শতক জায়গা থেকে ১০ লাখ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। সেই হিসাবে জঙ্গল সলিমপুরের হাজার ১০০ একর খাসজমির মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ছাড়া এই স্থানে গাছ, খনিজ সম্পদসহ বিভিন্ন সরকারি সম্পদ রয়েছে। এসব সরকারি সম্পদ পাহাড়খেকো ভূমিদস্যু সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের জোরে দখল করে রেখেছে। যা উদ্ধার করতে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো অভিযানে গেলে সর্বপ্রথম যে সমস্যার মুখোমুখি হয়, তা হলো এখানকার সংঘবদ্ধ বাসিন্দাদের সমন্বিত আচরণ। এই এলাকায় অভিযানে গিয়ে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রাণ হারান র‍্যাবের এক নায়েব সুবেদার। সময় তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন র‍্যাসদস্য একজন সোর্স গুরুতর আহত হন। আক্রমণ করে তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তবে শঙ্কার বিষয় হলো, ১৯ জানুয়ারি ওই অভিযান চলাকালে সন্ত্রাসীরা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায়। যা ওই এলাকার অভ্যন্তরে তাদের আধিপত্য ক্ষমতার এক প্রচ্ছন্ন প্রদর্শনী ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, হামলার পেছনে ইয়াছিন বাহিনী নুরুল হক ভান্ডারি জড়িত।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হন।

এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি র্যাবের সঙ্গে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ওই একই বছর আগস্ট অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে বাধাপ্রাপ্ত হন জেলা প্রশাসনের লোকজন। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে অবৈধ বসতি ভাঙতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর অভিযানে যায় প্রশাসন। সন্ত্রাসীরা সে সময় পুলিশের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়।

এর বাইরেও একাধিকবার অভিযানে গিয়ে এলাকাটিতে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটার যন্ত্র ড্রাম ট্রাক জব্দ করে কাজ বন্ধ করলেও রাত পোহালেই পুনরায় সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে শুরু হয় অবৈধ কার্যক্রম।

গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ শাসনামলে এখানকার শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন সময়ে সরকারদলীয় লোকজনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন জঙ্গল সলিমপুরের “আলীনগর বহুমুখী সমিতির” নেতা ইয়াসিন। এছাড়া জঙ্গল সলিমপুরের “মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের” নেতৃত্বস্থানীয় হিসেবে উঠে এসেছে কাজী মশিউর, গাজী সাদেকের নাম। জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে তৈরি করা প্লট যারা কেনেন, তারাই হন এই সমিতির সদস্য। বর্তমানে এই দুটি সমিতিতে সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার।

২০২৪ সালের আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জঙ্গল সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার মাত্রা বহুগুণে বেড়েছে। কয়েক মাস আগে সেখানে দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে একজন নিহত হন। পরদিন ওই বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক সন্ত্রাসীদের কর্তৃক মারধর হামলার শিকার হন। যার ফলে পুনরায় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে আলোচনায় উঠে আসে জঙ্গল সলিমপুরের নাম।

এছাড়া অবৈধ ব্যবসা, মাদক অস্ত্র ব্যবসাসহ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বেড়েছে। ২০১৯-২৫ পর্যন্ত অন্তত ১২টি বড় সংঘর্ষে ইয়াসিন গোষ্ঠীর জন রোকন গোষ্ঠীর জন নিহত হয়। সময় আহত হয় শতাধিক। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে এক সংঘর্ষে একজন নিহত বহু মানুষ হতাহত হন।

জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি দেখলেই প্রবেশমুখে পাহারায় থাকা নিরাপত্তাকর্মী সোর্সের মাধ্যমে দ্রুতই সন্ত্রাসীরা খবর পেয়ে যায়। এরপর সতর্ক হয়ে নিরাপদ স্থান থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি, ইট-পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত মার্চ ভোরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুরে বড় পরিসরে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে তিন হাজারের বেশি সদস্য অংশ নেয়। সময় অভিযান পরিচালনায় ড্রোন, সাঁজোয়া যান, ডগ স্কোয়াড এবং আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। অভিযানে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ বিস্ফোরক উদ্ধারের পাশাপাশি ২২ জনকে আটক করা হয়। এই অভিযান শেষে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

তবে এখন অব্দি যারা জঙ্গল সলিমপুরে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করেছেন, তাদের ভাষ্যমতে, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকাটিতে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গেই অবৈধ বসতি গড়ে তোলা লোকজন সন্ত্রাসী বাহিনী বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে যায়। এরপর তারা নিরাপদ স্থান থেকে হামলা শুরু করে। তাদের মতে, কেবল সামরিক অভিযান পরিচালনা করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি, ভূমি দখল অপরাধচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন বড় আকারের যৌথ অভিযান, সমন্বিত পুনর্বাসন পরিকল্পনা, কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি এবং টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ। নইলে জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় ভৌগোলিক পরিবেশ রক্ষা এবং সেখানে পরিচালিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কোনোটিই বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন