মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে ইসরায়েলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ইরানকে। কয়েক দশক ধরে চলে আসা এই ছায়া যুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এখন একটি ভিন্ন প্রশ্ন তুলছেন– যদি কোনোভাবে ইরানের বর্তমান ব্যবস্থার পতন ঘটে বা দেশটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তবে ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? রণকৌশলগত অবস্থান থেকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের পর ইসরায়েলের সম্ভাব্য ‘টার্গেট লিস্টে’ সবার ওপরে থাকবে তুরস্ক এবং পাকিস্তান।
ইরানের ‘প্রতিবন্ধকতা’ ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বলয়
ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক দর্শনে ‘পেরিফেরি ডকট্রিন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল তার সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য ইসরায়েলের মানচিত্রের বাইরে প্রসারিত করতে অত্যন্ত উদগ্রীব। ইরান বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আধিপত্য বিস্তারের পথে প্রধান বাধা। কিন্তু ইরান যদি তার বর্তমান প্রভাব হারায়, তবে ওই অঞ্চলে একধরনের শক্তি শূন্যতা (Power Vacuum) তৈরি হবে। ইসরায়েল চাইবে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এবং অন্য কোনো মুসলিম রাষ্ট্রকে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে না দিতে। আর ঠিক এখানেই তুরস্ক ও পাকিস্তানের নাম সামনে চলে আসে।
তুরস্ক: নয়া-অটোমান প্রভাব ও এরদোগান ফ্যাক্টর
তুরস্ক এবং ইসরায়েলের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ থাকলেও গত দেড় দশকে তা চরম বৈরিতায় রূপ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের নেতৃত্বে তুরস্ক নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। তুরস্ক বর্তমানে হামাসের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সমর্থক। ইরান যদি দৃশ্যপট থেকে সরে যায়, তবে তুরস্কই হবে ফিলিস্তিন আন্দোলনের প্রধান অভিভাবক। এটি ইসরায়েলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও আদর্শিক হুমকি।
এছাড়া তুরস্ককে এত বেশি গুরুত্ব দেয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে দেশটি ন্যাটোর সদস্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তির অধিকারী। ইসরায়েল মনে করে, ইরানের অনুপস্থিতিতে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে তা তাদের জন্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এরদোগানের কঠোর বাগাড়ম্বর এবং ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করা তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
পাকিস্তান: পারমাণবিক বোমা ও কৌশলগত ভীতি
পাকিস্তানের সাথে ইসরায়েলের কোনো সরাসরি সীমান্ত নেই এবং ঐতিহাসিকভাবে তাদের মধ্যে কোনো যুদ্ধও হয়নি। তবুও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নথিতে পাকিস্তান সবসময়ই একটি বিশেষ উদ্বেগের নাম। এর প্রধান কারণ পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি। পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম দেশ যার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। ইসরায়েল একে ‘ইসলামিক বোমা’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি অনুযায়ী, তারা মধ্যপ্রাচ্য বা তার আশেপাশে কোনো প্রতিকূল মুসলিম শক্তির হাতে পারমাণবিক অস্ত্র দেখতে চায় না। আশির দশকে ইরাকের ওসপিরাক পারমাণবিক চুল্লি ধ্বংস করা বা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ব্যাহত করার চেষ্টার মূলে ছিল এই একই দর্শন।
ইসরায়েল ভয় পায় যে, পাকিস্তান যদি কখনও তার পারমাণবিক বা উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তুরস্ক বা সৌদি আরবের মতো দেশের কাছে হস্তান্তর করে, তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ধসে পড়বে। সম্প্রতি পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে যে প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, তা যদি পুরোপুরি কার্যকর হয় তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বিশাল ধাক্কা দিতে পারে। ইরানের পতনের পর পাকিস্তান যদি আরও বেশি প্যান-ইসলামিক নীতি গ্রহণ করে, তবে ইসরায়েল দেশটিকে নিষ্ক্রিয় করার পরিকল্পনা করতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ও কৌশলগত আক্রমণ
ইসরায়েল অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সামরিক আক্রমণের বদলে সাধারণত ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ বা প্রক্সি যুদ্ধের ওপর নির্ভর করে। তুরস্কের ক্ষেত্রে ইসরায়েল কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের (PKK) পরোক্ষ সমর্থন দিতে পারে যেটি তুরস্ককে অভ্যন্তরীণভাবে ব্যস্ত রাখবে। এছাড়া পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সাথে তুরস্কের যে বিরোধ রয়েছে, সেখানে ইসরায়েল তুরস্কবিরোধী জোটকে শক্তিশালী করতে পারে।
অপরদিকে পাকিস্তানের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ইসরায়েলের জন্য একটি বড় সুযোগ। আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে চিহ্নিত করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং ভারতের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করে পাকিস্তানকে চাপে রাখাই হচ্ছে ইসরায়েলের প্রধান কৌশল।
কেন এই দেশগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা এই অঞ্চলের একক এবং অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা। ইরান যদি আজ দুর্বল হয়ে যায়, তবে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষমতা কেবল তুরস্ক ও পাকিস্তানেরই আছে। তুরস্কের রয়েছে অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি, আর পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক আভিজাত্য। এই দুই শক্তির সমন্বয় বা একক উত্থান ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইরান বর্তমানে ইসরায়েলের বিপক্ষে একটি ‘শিল্ড’ বা ঢাল হিসেবে কাজ করছে। কারণ ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের সব শক্তি ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু এই ঢালটি যখন ভেঙে পড়বে, তখন ইসরায়েলের দৃষ্টি প্রসারিত হবে আঙ্কারা এবং ইসলামাবাদের দিকে। যদিও তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং পাকিস্তানের সাথে আমেরিকার জটিল সম্পর্ক রয়েছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যে নিজের একাধিপত্য ধরে রাখতে ইসরায়েল যেকোনো চরম পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না। ভবিষ্যৎ বিশ্বরাজনীতিতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের ওপর ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক নজরদারি যে কয়েকগুণ বাড়বে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।