Ridge Bangla

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘাত: ডুরান্ড লাইনে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠছে কেন?

​দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় বিস্ময় ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার নজিরবিহীন সীমান্ত সংঘাত। যদিও দুই দেশের মধ্যে এখনো সর্বাত্মক বা আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়নি, কিন্তু সীমান্তে ভারী গোলাবর্ষণ, বিমান হামলা, সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে সরাসরি বন্দুকযুদ্ধ এবং প্রধান বাণিজ্যিক ক্রসিংগুলো বারবার বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা এক অঘোষিত যুদ্ধাবস্থারই ইঙ্গিত দেয়। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তান সরকার প্রকাশ্যে উল্লাস প্রকাশ করেছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ‘মিত্র’ তালেবানের সাথেই পাকিস্তানের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই, থাকে কেবল স্থায়ী স্বার্থ।

​সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিত পাক-আফগান সীমান্তে যে উত্তেজনা দেখা গেছে, তা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে নজিরবিহীন। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর এই মুখোমুখি অবস্থানের পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা দায়ী নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এই সংঘাতের প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয় সামনে উঠে আসে।

​তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ

​বর্তমান পাক-আফগান উত্তেজনার সবচেয়ে বড় এবং প্রধান কারণ হলো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ইস্যু। পাকিস্তানের দাবি, আফগান তালেবান ক্ষমতায় আসার পর টিটিপি জঙ্গিরা আফগানিস্তানের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে এবং সেখান থেকে তারা পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে ভয়াবহ সব সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তান বারবার কাবুলকে টিটিপি-র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানালেও, আফগান তালেবান দৃশ্যত কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো তারা একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলে আখ্যায়িত করেছে। ​

এর চরম পরিণতি হিসেবে পাকিস্তান সম্প্রতি আফগানিস্তানের খোস্ত ও পাকতিকা প্রদেশের মতো সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে টিটিপি-র গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একটি স্বাধীন দেশের ভূখণ্ডে এমন বিমান হামলা আফগান তালেবান তাদের সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে এবং এর কড়া জবাব হিসেবে পাকিস্তানি সেনা চেকপোস্টগুলোতে ভারী আর্টিলারি ও মর্টার হামলা চালিয়েছে।

​ঐতিহাসিক ডুরান্ড লাইন বিতর্ক

​পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার প্রায় ২,৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তটি ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত, যা ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তানের কোনো সরকারই, এমনকি বর্তমান তালেবান সরকারও এই সীমান্তকে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। আফগানদের দাবি, এই রেখা পশতুন জাতিগোষ্ঠীকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।

​উত্তেজনার পারদ চরমে ওঠে যখন পাকিস্তান এই ডুরান্ড লাইন বরাবর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ প্রায় সম্পন্ন করে আনে। আফগান তালেবান সীমান্তরক্ষীরা বারবার এই বেড়া নির্মাণে বাধা দিয়েছে, বেড়া উপড়ে ফেলেছে এবং পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। তোরখাম ও চমন সীমান্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংগুলোতে প্রায়শই এই বেড়া নির্মাণ এবং চেকপোস্ট স্থাপনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে।

​আফগান শরণার্থীদের ‘গণবহিষ্কার’

​সংঘাতের আগুনে ঘি ঢেলেছে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। পাকিস্তান সরকার তাদের দেশে বসবাসরত প্রায় ১৭ লাখ অবৈধ বা অনিবন্ধিত আফগান শরণার্থীকে জোরপূর্বক আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। পাকিস্তানের দাবি, দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। ​তবে আফগান তালেবান এই গণ-বহিষ্কারকে একটি অমানবিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। কাবুলের মতে, পাকিস্তান টিটিপি ইস্যুতে আফগানিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সাধারণ শরণার্থীদের ‘গুটি’ হিসেবে ব্যবহার করছে। শীতের প্রকোপ এবং আফগানিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতির মাঝে লাখ লাখ মানুষের এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।

​অর্থনৈতিক অবরোধ ও ট্রানজিট বাণিজ্য ইস্যু

​স্থলবেষ্টিত দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য আফগানিস্তান বহুলাংশে পাকিস্তানের করাচি বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সীমান্ত উত্তেজনার জের ধরে পাকিস্তান বারবার তোরখাম এবং চমন বর্ডার ক্রসিং বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে করে আফগানিস্তানের হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়ছে, কাঁচামাল পচে যাচ্ছে এবং আফগান অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তালেবান সরকার পাকিস্তানের এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে দেখছে এবং এর বিকল্প হিসেবে ইরানের চাবাহার বন্দরের দিকে ঝুঁকছে, যা পাকিস্তানের জন্য ভূ-রাজনৈতিকভাবে একটি বড় ক্ষতি।

​পাকিস্তান একসময় আফগানিস্তানে তাদের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বা কৌশলগত গভীরতা অর্জনের জন্য তালেবানকে সমর্থন ও মদদ জুগিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, পাকিস্তানের সেই নীতি বুমেরাং হয়ে তাদের দিকেই ফিরে এসেছে। আফগান তালেবান এখন আর পাকিস্তানের আজ্ঞাবহ কোনো প্রক্সি গোষ্ঠী নয়, বরং তারা একটি স্বাধীন এবং জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ​পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের এই যুদ্ধাবস্থা শুধু এই দুই দেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। দুই দেশই যদি সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে এই সংকটের সমাধান খুঁজতে চায়, তবে তা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে। এই নজিরবিহীন উত্তেজনা প্রশমনে চীন বা জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর দ্রুত মধ্যস্থতা প্রয়োজন, অন্যথায় এই ‘অঘোষিত যুদ্ধ’ যেকোনো মুহূর্তে সর্বাত্মক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার খেসারত দিতে হবে এই অঞ্চলের লাখো সাধারণ মানুষকে।

This post was viewed: 7

আরো পড়ুন