Ridge Bangla

পডকাস্ট: বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ‘অল্টারনেটিভ মিডিয়া’র দ্রুত প্রসার

সম্প্রতি ফাহাম আবদুস সালাম এবং সালমান মুক্তাদির ‘সামিরস্ক্যান’ নামের একটি পডকাস্ট শো-তে এসেছিলেন। সেখানে তারা যে বক্তব্যগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো ‘টক অব দ্য টাউন’ এ পরিণত হতে খুব বেশি সময় নেয়নি। আসলে একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

একসময় রাজনীতির আড্ডা মানেই ছিল চায়ের দোকান কিংবা ড্রয়িং রুমের টেলিভিশন টকশো। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই চিরাচরিত দৃশ্যপটে ভাগ বসিয়েছে স্মার্টফোনের ছোট পর্দা। বিশেষ করে পডকাস্ট বা দীর্ঘ ফরম্যাটের অডিও-ভিজ্যুয়াল কথোপকথন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বয়ান বা ‘পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ’ তৈরিতে এক শক্তিশালী ‘অল্টারনেটিভ মিডিয়া’ বা বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

​মূলধারার সংকটে বিকল্পের উত্থান

বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো প্রায়ই সেন্সরশিপ, সেলফ-সেন্সরশিপ এবং নানাবিধ রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। টেলিভিশনের টকশোগুলোতে সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং নির্দিষ্ট ছকের বাইরে কথা বলার সুযোগ কম থাকায় দর্শক ক্রমশ একঘেয়েমি অনুভব করছিল। ঠিক এই শূন্যস্থানেই পডকাস্ট নিজের জায়গা করে নিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই, নেই বিজ্ঞাপনের অযাচিত বিরতি- ফলে আলোচক ও সঞ্চালক উভয়েই গভীরে গিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পাচ্ছেন। এই ‘আনফিল্টারড’ বা ছাঁকনহীন আলোচনার প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহই পডকাস্টের দ্রুত প্রসারের মূল কারণ।

রাজনৈতিক সচেতনতা ও তরুণ প্রজন্ম

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক বড় অংশ তরুণ। এই ডিজিটাল নেটিভ প্রজন্ম তথ্যের জন্য খবরের কাগজের চেয়ে ফেসবুক, ইউটিউব বা স্পটিফাইয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল। সম্প্রতি ফ্যাসিস্ট শাসনের পতন ঘটানোর পর এই প্রজন্মের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ আরও তুঙ্গে। রাজনৈতিক দলগুলো এবং স্বতন্ত্র বিশ্লেষকরা বুঝতে পেরেছেন যে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হলে পডকাস্টের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, জাঁকজমকপূর্ণ স্টুডিওর চেয়ে একটি সাধারণ ঘরে বসে করা পডকাস্টের ভিউ বা দর্শকসংখ্যা টেলিভিশন খবরের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি হচ্ছে। এখানে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণগুলোকে সহজ ভাষায় এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, যা নতুন ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

​কেন পডকাস্ট এত জনপ্রিয়?

পডকাস্টের জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি টেকনিক্যাল ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। ইন্টারনেটের খরচ কমে আসা এবং স্মার্টফোনের বিস্তার পডকাস্টকে মানুষের পকেটে পৌঁছে দিয়েছে। যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় কিংবা অবসরে মানুষ সহজেই দীর্ঘ আলোচনা শুনতে পারছে। টেলিভিশনের ১০ মিনিটের আলোচনার চেয়ে পডকাস্টের দেড়-দুই ঘণ্টার আলোচনায় একটি বিষয়ের আদ্যোপান্ত উঠে আসে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যা অত্যন্ত জরুরি ছিল। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হওয়ার কারণে এখানে মূলধারার মিডিয়ার মতো কঠোর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে অনেক স্পর্শকাতর বিষয়েও এখানে খোলামেলা আলোচনা সম্ভব হচ্ছে।

​অল্টারনেটিভ মিডিয়া হিসেবে প্রভাব

পডকাস্ট এখন আর কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি জনমত গঠনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী এবং অ্যাক্টিভিস্টরা এখন সরাসরি পডকাস্টে অংশ নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পডকাস্টে দেওয়া কোনো বক্তব্য পরবর্তী কয়েক দিন ধরে মূলধারার পত্রিকায় সংবাদ হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। অর্থাৎ, এজেন্ডা সেট করার ক্ষমতা এখন আর কেবল বড় বড় মিডিয়া হাউসের হাতে নেই; বরং একজন দক্ষ পডকাস্টারও এখন জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারছেন। এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক দিক, কারণ এটি তথ্যের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাচ্ছে।

​চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক

তবে এই দ্রুত প্রসারের মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। পডকাস্ট যেহেতু অনেকটা নিয়ন্ত্রণমুক্ত, তাই এখানে মাঝেমধ্যেই গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে। তথ্যের সত্যতা যাচাই বা ‘ফ্যাক্ট চেকিং’-এর বালাই অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। এছাড়া পডকাস্টের মাধ্যমে রাজনৈতিক মেরুকরণ বা ‘পোলারাইজেশন’ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দর্শক অনেক সময় কেবল নিজের মতাদর্শের পডকাস্টই শোনেন, যা তাকে অন্য পক্ষের যুক্তি শোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে।

​ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পডকাস্ট কেবল শুরু। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার এবং ভিডিও পডকাস্টিংয়ের মানোন্নয়ন একে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আগামী সাধারণ নির্বাচনগুলোতে এই অল্টারনেটিভ মিডিয়া যে প্রচার-প্রচারণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোকেও এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পডকাস্ট ফরম্যাটে ঝুঁকতে হচ্ছে।

পডকাস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এটি সাধারণ মানুষকে চিন্তার খোরাক দিচ্ছে এবং জটিল রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সহজবোধ্য করছে। যদিও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে অল্টারনেটিভ মিডিয়া হিসেবে পডকাস্টের এই অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে যে, মানুষ এখন কেবল তথ্য চায় না, বরং সেই তথ্যের পেছনের সত্য এবং বিশ্লেষণও শুনতে চায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আধুনিকায়নে পডকাস্ট নিঃসন্দেহে এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন