বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেই একটি বিষয় অবধারিতভাবে রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনায় কেন্দ্রে চলে আসে, তা হলো ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’। রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নাগরিকত্ব বিষয়টি গৌরবের হলেও, দেশের নীতি নির্ধারণী বা আইন প্রণয়নকারী পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে রয়েছে কঠোর সাংবিধানিক বিধিনিষেধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের মনোনয়ন বাতিল হওয়া বা পদ হারানোর ঘটনায় এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সংবিধানের বিধান: অযোগ্যতার মাপকাঠি
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদের ২(গ) উপ-দফায় দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে:
”কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন।”
এই সাংবিধানিক বিধানের মূল বার্তা হলো- যদি কেউ বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন বা অন্য দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন, তবে তিনি বাংলাদেশের আইনসভার সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। এটি কেবল নির্বাচনের সময় নয়, নির্বাচিত হওয়ার পরেও যদি কেউ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তবে তার সদস্যপদ শূন্য হয়ে যাবে।
পুনরায় যোগ্য হওয়ার সাংবিধানিক পদ্ধতি
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, দ্বৈত নাগরিকরা কি কখনোই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না? উত্তর হলো- পারবেন, তবে এর জন্য একটি নির্দিষ্ট আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। প্রথমত, প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব আইনসম্মতভাবে ত্যাগ করতে হবে। কেবল পাসপোর্ট সমর্পণ করা বা মৌখিকভাবে ঘোষণা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; সেই দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে নাগরিকত্ব ত্যাগের আনুষ্ঠানিক সনদ বা স্বীকৃতি গ্রহণ করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশী নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন, তবে তাকে সেই ত্যাগের পর একটি নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করতে হয় কি না, তা নিয়ে প্রায়ই আইনি বিতর্ক ওঠে। তবে মূল শর্ত হলো- মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন প্রার্থীর কেবল বাংলাদেশের নাগরিকত্ব থাকতে হবে এবং বিদেশী নাগরিকত্বের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা তার ওপর থাকা চলবে না। হাইকোর্টের বিভিন্ন রায়ে দেখা গেছে, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করার পর তা কার্যকর হতে যে সময় লাগে, সেই সময়ের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিলে তা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ, নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াটি মনোনয়ন দাখিলের আগেই শতভাগ সম্পন্ন হতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ ও জটিলতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিধানের প্রয়োগ বেশ বিতর্কিত এবং চাঞ্চল্যকর। বিভিন্ন নির্বাচনে অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে এই দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনেও এই বিধানের কারণে অনেকেরই প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা হয়েছে বা হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম আইনি পার্থক্য রয়েছে যা নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বাংলাদেশ সরকার ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব বিধিমালা’ অনুযায়ী প্রবাসীদের নাগরিকত্ব বজায় রাখার সুযোগ দেয়। কিন্তু এটি কেবল সম্পত্তি ভোগদখল বা যাতায়াতের সুবিধার জন্য। রাজনৈতিক অধিকার বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ এই বিশেষ বিধিমালাকে পাশ কাটিয়ে কার্যকর হয়। অর্থাৎ, আপনি বাংলাদেশে জমি কিনতে পারবেন দ্বৈত নাগরিক হিসেবে, কিন্তু আইন প্রণেতা হতে পারবেন না।
আদালতের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলোতে দেখা গেছে, যারা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি কিন্তু পরে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন, তারা যদি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ‘পুনরদ্ধার’ করেন এবং বিদেশী নাগরিকত্ব ‘পুরোপুরি ত্যাগ’ করেন, তবেই তারা প্রার্থী হতে পারবেন। ইতঃপূর্বে মনোনয়ন নিয়ে বেশ কিছু আইনি লড়াইয়ে বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, বিদেশী পাসপোর্ট সঙ্গে রাখা বা বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের সামান্যতম প্রমাণ থাকলেই প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়।
এই বিধানের অন্তর্নিহিত কারণ
সংবিধানে কেন এই কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে? এর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কারণ রয়েছে।
প্রথমত, একজন সংসদ সদস্য বাংলাদেশের আইন প্রণয়ন করেন এবং রাষ্ট্রীয় সংহতির শপথ নেন। তিনি যদি একই সাথে অন্য কোনো দেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ (যা অধিকাংশ দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের সময় নিতে হয়) নিয়ে থাকেন, তবে তার আনুগত্য দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জাতীয় স্বার্থ ও বিদেশী স্বার্থের দ্বন্দ্বে তিনি কার পক্ষ নেবেন- এই আশঙ্কা থেকেই এই বিধিনিষেধ।
দ্বিতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো অপরাধ বা দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়লে দ্বৈত নাগরিকরা সহজেই অন্য দেশে পালিয়ে যান এবং সেই দেশের নাগরিক হিসেবে সুরক্ষা দাবি করেন। বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে হলে তার সকল দায়বদ্ধতা ও জীবনের ঝুঁকি এই দেশকেন্দ্রিক হতে হবে- এমনটাই সংবিধান প্রণেতারা চেয়েছেন।
আর সর্বশেষ কারণ হচ্ছে আইনসভার সদস্য হিসেবে অনেক সময় স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক চুক্তি বা প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কোনো শক্তির নাগরিক হন, তবে সেখানে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার একটি তাত্ত্বিক সম্ভাবনা থেকে যায়।
উপসংহার
প্রবাসীরা বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। তাদের মেধা ও অর্থ দেশকে সমৃদ্ধ করছে। তবে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে আসীন হতে হলে পূর্ণকালীন এবং একক আনুগত্যের যে দাবি সংবিধান করে, তা অনস্বীকার্য। ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’ বিতর্কটি আসলে কেবল একটি আইনি বিষয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতি একজন নাগরিকের সর্বোচ্চ নিবেদনের পরীক্ষা। তাই যারা প্রবাসে থেকেও দেশের আইনসভায় আসতে চান, তাদের জন্য সাংবিধানিক পথটি কণ্টকহীন নয়, বরং ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হতে হয়।