Ridge Bangla

দক্ষিণ এশিয়ার তিন শক্তি: বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চালচিত্র

পুরো ভারতবর্ষে একসময় সীমান্তনির্দেশক কাঁটাতারের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অর্থাৎ আজকের দিনে যে ভূখণ্ডগুলো ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ নামে পরিচিত, সেগুলো একসময় একটি একক ভূখণ্ড হিসেবেই পরিচিত ছিল। অবিভক্ত এই ভূখন্ডের নাম ছিল ‘ভারতবর্ষ’। পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল শেষ হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এরপর পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান নামে যে অংশটি ছিল, সেটি ১৯৭১ স্বাধীনতা লাভ করে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এই তিন দেশের অবস্থান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের অর্থনৈতিক পথচলাও কৌতূহলোদ্দীপক। গত কয়েক দশকে এই তিন দেশ উন্নয়নের ভিন্ন ভিন্ন মডেল অনুসরণ করেছে, যার ফলে এদের মাথাপিছু জাতীয় আয় এবং জীবনযাত্রার মানে লক্ষ্যণীয় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

​অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো মাথাপিছু জাতীয় আয়। এটি একটি দেশের মোট আয়কে তার জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যায়, যা নাগরিকদের গড় জীবনযাত্রার মানের একটি ধারণা দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাথাপিছু আয়ের দৌড়ে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের বেশ কাছাকাছি অবস্থান করছে, যেখানে পাকিস্তান অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পাশাপাশি মাথাপিছু জাতীয় আয়ের পেছনে যেখানে বেশ কয়েকটা পৃথক কারণ রয়েছে। আবার পাকিস্তানের গড় মাথাপিছু আয় কম হওয়ার জন্যও বেশ কিছু নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।

​স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ছিল খুবই সংকটাপন্ন। শুরুর বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, লাগামহীন দুর্নীতি এবং সদ্যস্বাধীন দেশে সুশাসনের অভাবে দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন থমকে দাঁড়িয়েছিল। এরপর ধীরগতিতে উন্নয়ন হতে থাকে। সর্বশেষ দুই দশকে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে, বর্তমান মাথাপিছু আয় (Nominal GDP per capita) প্রায় ২৭৩০ মার্কিন ডলার। তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের আয় বৃদ্ধিতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

​দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে ভারতের মাথাপিছু আয় বর্তমানে প্রায় ২,৮২০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। বৃহৎ বাজার এবং শক্তিশালী তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতের কারণে ভারতের আয় স্থিতিশীলভাবে বাড়ছে। তবে বিশাল জনসংখ্যার কারণে গড় আয় বৃদ্ধির হার বাংলাদেশের তুলনায় কিছুটা ধীর বলে অনেক সময় মনে হয়। ​

অপরদিকে পাকিস্তানের চিত্রটি বর্তমানে বেশ উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক ঋণের চাপে দেশটির মাথাপিছু আয় গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ১৭১০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে)। ক্রয়ক্ষমতার সমতার (PPP) ভিত্তিতেও দেশটি প্রতিবেশী দুই দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। ​এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, গত দশকে বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, তা তাকে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে দিয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে সমানে সমান পাল্লা দেওয়ার পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

​জাতীয় গড় আয় একটি সামগ্রিক চিত্র দিলেও দেশের ভেতরে সব অঞ্চল সমানভাবে উন্নত হয় না। ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই আঞ্চলিক বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। ​ভারতে রাজ্যগুলোর মধ্যে মাথাপিছু আয়ের বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যায়। গোয়া, সিকিম, দিল্লি বা তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যগুলোর মাথাপিছু আয় যেখানে ৪,০০০ থেকে ৬০০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, সেখানে বিহার বা উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে তা ১,০০০ ডলারের নিচে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ জড়িত। একদিকে যেমন ভৌগলিক কারণে একটি দেশের কোন অঞ্চল পিছিয়ে পড়তে পারে, আবার রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেও সেটি হতে পারে।

মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু ও গুজরাটের মতো উপকূলীয় রাজ্যগুলো সমুদ্রবন্দরের সুবিধার কারণে আগে থেকেই শিল্পায়নে এগিয়ে গেছে। ফলে তারা যে অর্থনৈতিক ভিত্তি পেয়েছে, সেটিকে কেন্দ্র করে প্রদেশগুলো দ্রুত উন্নয়নের দিকে ধাবিত হতে পেরেছে। বর্তমানে প্রযুক্তিকেন্দ্রিক বিশ্বে যে অঞ্চলগুলো তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্ব আরোপ করেছে, তারাই তরতর করে উন্নয়ন করগে পেরেছে।

বেঙ্গালুরু (কর্ণাটক) ও হায়দ্রাবাদ (তেলেঙ্গানা) ভারতের আইটি হাব হওয়ায় এই অঞ্চলে উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আবার কেরালা বা তামিলনাড়ুর মতো দক্ষিণী রাজ্যগুলোতে শিক্ষার হার এবং সামাজিক সূচকগুলো উন্নত হওয়ায় মাথাপিছু আয়ও বেশি। অন্যদিকে বিহার বা ঝাড়খণ্ডের মতো স্থলবেষ্টিত রাজ্যগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অবকাঠামোর অভাব আয় কম থাকার অন্যতম প্রধান কারণ।

​পাকিস্তানেও আয়ের সিংহভাগ দখল করে আছে পাঞ্জাব এবং সিন্ধু প্রদেশের শহরাঞ্চল। অন্যদিকে বেলুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়া চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। পাকিস্তানের রাজনীতি ও সেনাবাহিনীতে পাঞ্জাব অঞ্চলের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে এই অঞ্চলে উন্নয়নমূলক কাজ বেশি হয়েছে। আবার করাচি (সিন্ধু) ও লাহোর (পাঞ্জাব) পাকিস্তানের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। অথচ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হয়েও বেলুচিস্তান উপযুক্ত বিনিয়োগের অভাবে পিছিয়ে আছে। খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানি, বিভিন্ন সামাজিক সূচকের উন্নয়ন এবং ও প্রবাসীদের পাঠানো বিশাল অংকের রেমিট্যান্স। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশ নিজেকে খুবই শক্ত অবস্থানে নিয়ে গিয়েছে।

​এর পাশাপাশি বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। তাদেরকে আমরা ‘প্রবাসী’ বলে থাকি। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখে। তাদের পাঠানো বিশাল অংকের অর্থ দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস এবং নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় রোল মডেল।

​বাংলাদেশের অর্থনীতির যেমন বেশ কিছু সবল দিক রয়েছে, তেমনই এর বেশ কিছু দুর্বল দিকও রয়েছে। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির দুর্বলতাগুলো উন্মোচিত করে দেয়। বাংলাদেশের আয়ের ৮৫% এর বেশি আসে কেবল পোশাক খাত থেকে। অন্য কোনো বড় খাত এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে এই খাত যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতি সংকটের মুখে পড়ে যাবে। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এবং দুর্নীতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট শিল্প উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। প্রতি বছর জ্বালানি সংকটের ফলে ফ্যাক্টরিগুলো তার পূর্ণ উৎপাদনশীলতা অর্জন করতে পারে না, যেটি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

​১.৪ বিলিয়ন মানুষের বিশাল দেশ ভারতের বাজার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রধান আকর্ষণ। পৃথিবীর যেকোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানই এই বিশাল বাজার হাতছাড়া করতে চাইবে না। ভারতের অর্থনীতির খুবই শক্তিশালী একটি দিক হচ্ছে প্রযুক্তি খাতে গত দুই দশকে দেশটি দারুণ উন্নতি করেছে। ভারত বিশ্বের সফটওয়্যার রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

​এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক, রেলপথ এবং ডিজিটাল লেনদেনে (UPI) ভারত অভাবনীয় উন্নতি করেছে। তবে এই দেশটির অর্থনীতির কিছু দুর্বল দিকও রয়েছে।

​ভারতের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনও বেকার। বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া দেশটিতে আয়বৈষম্যও প্রকট। আম্বানি-আদানিদের মতো ধনকুবেরদের উত্থান হলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সেভাবে বাড়েনি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখনও দেশটিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করে।

কৃষি-প্রধান অর্থনীতি পাকিস্তানের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী দিক। পাকিস্তানের বিশাল সেচ ব্যবস্থা এবং তুলা ও গমের উৎপাদন দেশটির অর্থনীতির ভিত্তি। দেশটির বিশাল একটি অংশ তরুণ, যাদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিলে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে।

​এছাড়া চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) সফল হলে দেশটি একটি বাণিজ্যিক ট্রানজিট পয়েন্ট হতে পারে। তবে দেশটির শক্তিশালী দিকে তুলনায় দুর্বলতাই বেশি। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন এবং অস্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে।

​দেশটির জিডিপির একটি বড় অংশ ব্যয় হয় ঋণের সুদ দিতে, ফলে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যে খরচ করার অর্থ থাকে না। নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন বর্তমানে দুর্বিষহ।

​তিন দেশের অর্থনীতিকে যদি আমরা একনজরে দেখি, তবে দেখা যাবে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে, ভারত বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার পথে এগোচ্ছে, আর পাকিস্তান এখন কেবল টিকে থাকার লড়াই করছে। ​

বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এলডিসি (LDC) উত্তরণ পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং অর্থনীতির বহুমুখীকরণ করা। ভারতের বর্তমান কর্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে তার দারিদ্র্যপীড়িত উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়া যাতে বৈষম্য কমে আসে। আর পাকিস্তানের জন্য আশু প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য এবং কঠোর সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। ​

দক্ষিণ এশিয়ার এই তিন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করবে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষাতেও বড় ভূমিকা রাখবে। আগামী এক দশকে কে কতটুকু উন্নতি করতে পারবে, তা নির্ভর করবে তাদের নীতি নির্ধারণ এবং বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার দক্ষতার ওপর।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন