Ridge Bangla

তৃতীয় বিশ্বে গণতন্ত্রের সংকট: এক অন্তহীন গোলকধাঁধা

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো যখন একে একে ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন হতে শুরু করে, তখন তাদের সামনে প্রধান স্বপ্ন ছিল ‘গণতন্ত্র’। ভাবা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের শোষণ আর পরাধীনতা শেষে সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা আসাই হবে মুক্তির সোপান। কিন্তু কয়েক দশক পেরিয়ে এসে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ তৃতীয় বিশ্বের দেশে গণতন্ত্র এখনো এক অপূর্ণ স্বপ্ন। কোথাও সামরিক শাসন, কোথাও একনায়কতন্ত্র, আবার কোথাও নামমাত্র নির্বাচনের মোড়কে ‘হাইব্রিড’ ব্যবস্থা জেঁকে বসেছে। প্রশ্ন জাগে, কেন এসব দেশে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খায়?

ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার ও ভঙ্গুর কাঠামো

তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। ব্রিটিশ, ফরাসি বা ডাচরা যখন তাদের কলোনিগুলো ছেড়ে চলে যায়, তখন তারা ক্ষমতার একটি আমলাতান্ত্রিক ও দমনমূলক কাঠামো রেখে গিয়েছিল। গণতন্ত্রের জন্য যে ধরনের শক্তিশালী বিচার বিভাগ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং গণমাধ্যমের প্রয়োজন ছিল, তা এসব দেশে গড়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। ফলে স্বাধীনতার পর ক্ষমতার লড়াই শুরু হলে এই দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো আর গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে পারেনি।

অর্থনৈতিক দৈন্য ও সামাজিক অসাম্য

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিপসেট (Seymour Martin Lipset) বলেছিলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতন্ত্র হাত ধরাধরি করে চলে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর একটি বড় অংশ চরম দারিদ্র্য ও অসাম্যের শিকার। যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান- অনিশ্চিত, সেখানে ব্যালট পেপারের চেয়ে দুই বেলা আহার অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে দাঁড়ায়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহজেই অর্থের বিনিময়ে বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে প্রভাবিত করা যায়। ফলে নির্বাচনগুলো হয়ে পড়ে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে না।

​প্রতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন

গণতন্ত্রের প্রাণ হলো চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স (Checks and Balances) বা ক্ষমতার ভারসাম্য। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে প্রায়শই দেখা যায় ক্ষমতার প্রচণ্ড কেন্দ্রীভবন। সরকার বা রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি নিজেকে ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে নিয়ে যান। এখানে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না এবং সংসদ কেবল সরকারি দলের রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন গণতন্ত্রের মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে।

​সেনাবাহিনীর উচ্চাভিলাষ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার একটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো সেনাবাহিনীর বারবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। পাকিস্তান, মিয়ানমার বা বহু আফ্রিকান দেশে দেখা গেছে, বেসামরিক সরকার যখনই কোনো সংকটে পড়েছে বা সেনাবাহিনী যখনই নিজেদের স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করেছে, তখনই তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। একবার ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া সেনাবাহিনী সহজে ব্যারাকে ফিরে যেতে চায় না। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয় এবং দেশ সামরিক চক্রের আবর্তে পড়ে যায়।

​রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শিক্ষার অভাব

গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পরমতসহিষ্ণুতা। তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় ‘জিরো সাম গেম’ (Zero-sum game) মানসিকতা, অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা। এছাড়া শিক্ষার অভাব এবং রাজনৈতিক সচেতনতার ঘাটতির কারণে জনগণ সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচনে ভুল করে। পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি বা বংশপরম্পরায় ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রবণতাও প্রকৃত গণতন্ত্র বিকাশের পথে একটি বড় অন্তরায়।

​ভূ-রাজনীতি ও বিদেশি হস্তক্ষেপ

তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্র অনেক সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত অনেক শক্তিশালী দেশ তাদের নিজেদের স্বার্থে তৃতীয় বিশ্বের একনায়ক বা সামরিক শাসকদের সমর্থন দিয়ে আসছে। যখন কোনো গণতান্ত্রিক সরকার বিদেশি শক্তির স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করে, তখন কৃত্রিমভাবে অস্থিরতা তৈরি করে সেই সরকারের পতন ঘটানোর নজিরও কম নেই। এই বিদেশি হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিবর্তনকে রুদ্ধ করে দেয়।

তৃতীয় বিশ্বে গণতন্ত্রের ব্যর্থতা কোনো একটি একক কারণে ঘটে না; এটি ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জটিলতার এক মিশ্র ফল। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, বরং আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অপরিহার্য। যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার চেয়ে জনগণের স্বার্থকে বড় করে দেখবে না এবং সমাজ থেকে অসাম্য দূর হবে না, ততক্ষণ গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের পাতায় শোভা পাবে, সাধারণ মানুষের জীবনে তার সুফল পৌঁছাবে না। তবে আশার কথা হলো, মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন, আর সেই আকাঙ্ক্ষাই একদিন হয়তো এই গোলকধাঁধা থেকে উত্তরণের পথ দেখাবে।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন