দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক নির্বাসন জীবন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশে ফেরার পরপরই তিনি যে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ঘোষণা দিয়েছেন, সেটিই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের মূল ভিত্তি হতে যাচ্ছে। দলীয় ও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, দেশের অর্থনীতি, গণতন্ত্র, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক সেবাখাতের সংস্কার সবকিছুকে একসূত্রে গেঁথে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হবে বিএনপির ইশতেহারে।
২০০৮ সালে কারামুক্ত হয়ে লন্ডনে পাড়ি জমান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর, যখন তিনি দেশে ফেরেন। দেশে ফিরেই তিনি স্পষ্ট করে জানান, ক্ষমতার রাজনীতির চেয়ে তার লক্ষ্য দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের ঐতিহাসিক বক্তব্যের অনুকরণে তিনি বলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল, ফর মাই কান্ট্রি।’ এরপর থেকেই তার পরিকল্পনা ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আগ্রহ ও আলোচনা বাড়তে থাকে।
রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান তার পরিকল্পনার নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজনীতি যদি কেবল সেমিনার, সিম্পোজিয়াম কিংবা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়। সংবিধান ও আইন সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তারেক রহমানের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারীর ক্ষমতায়ন। তিনি জানান, দেশে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে এবং প্রতিটি পরিবারের নারীদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে নারীরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাবেন। তার ভাষায়, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী; তাদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছিলেন, আর আগামী দিনে বিএনপি নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে চায়।
কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে বিএনপির পরিকল্পনায় রয়েছে ‘কৃষক কার্ড’। তারেক রহমান বলেন, দেশে প্রায় এক কোটি কৃষক সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত। অতীতে বিএনপি সরকার কৃষকদের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিল। নতুন করে কৃষক কার্ড চালুর মাধ্যমে সার, বীজ, কৃষিযন্ত্র ও অন্যান্য উপকরণে ভর্তুকি দেওয়া হবে। এতে কৃষকরা উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন এবং খাদ্যনিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য খাতে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তারেক রহমান। ইউরোপীয় দেশগুলোর আদলে কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। এ লক্ষ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কথা বলেছেন তিনি, যাদের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ হবেন নারী। এসব স্বাস্থ্যকর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুষ্টি, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও জীবনযাপন বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। একই সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও তারা ভূমিকা রাখবেন। তারেক রহমান বলেন, সীমিত সম্পদের দেশে জনসংখ্যাকে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ ও দক্ষতা বৃদ্ধিও বিএনপির ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারেক রহমান বলেন, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে গেলেও বড় একটি অংশ অদক্ষ থাকায় প্রত্যাশিত আয় আসে না। ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মী পাঠানো গেলে রেমিট্যান্স আয় বহুগুণ বাড়বে। এ জন্য ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ এবং প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বন্ড চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আইটি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। তারেক রহমান বলেন, দেশের আইটি পার্কগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প খরচে অফিস স্পেস, ফ্রি ওয়াইফাই ও ব্যবসায়িক ঠিকানা নিশ্চিত করা হবে। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে, বিশেষ করে পেপ্যালের মতো সেবার জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহির ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় ও স্থানীয় সরকারসহ সব স্তরে নিয়মিত নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতদিন সাংবিধানিক ও আইনগত সংস্কার নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকেছে। বিএনপি এসব জায়গায় বাস্তবমুখী সংস্কার আনতে চায়।
ঢাকার ভয়াবহ পানি সংকট নিয়েও সতর্কবার্তা দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী ১০–১৫ বছরের মধ্যে রাজধানীতে নিরাপদ পানির মারাত্মক সংকট দেখা দেবে। বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার দূষণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেঘনা থেকেও পানি আনার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না, যদি দূষণ রোধ না করা যায়। পানি সংকট নিয়ে এখনই জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা ও পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় থেকেই তারেক রহমানের রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তার প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়। ২০০৯ সালে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২০১৮ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান তিনি। সম্প্রতি দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং বিএনপির আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা। ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবসহ এসব পরিকল্পনা যুক্ত করেই খুব শিগগির বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইশতেহারই আগামী নির্বাচনে বিএনপির মূল রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠবে।