একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে যখন তার জনমিতিক কাঠামো উন্নয়নের এক অনন্য চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় এই সুযোগই হলো ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’। যখন কোনো দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা (১৫ থেকে ৬৪ বছর) নির্ভরশীল মানুষের (শিশু ও বৃদ্ধ) সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন সেই দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক বিশেষ সুযোগ লাভ করে। বাংলাদেশ বর্তমানে ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণ পার করছে। এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে এশিয়ার অনেক দেশ আজ উন্নত বিশ্বের কাতারে নাম লিখিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি যেমন এক বিশাল সম্ভাবনার আকাশ, তেমনি সময়মতো সঠিক পরিকল্পনা নিতে না পারলে এটি এক বোঝা বা সংকটে পরিণত হতে পারে।
পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মতে, কোনো দেশের জনসংখ্যার অন্তত ৬৬ শতাংশ যখন কর্মক্ষম থাকে, তখন তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০১২ সাল থেকে এই জানালাটি খুলতে শুরু করেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে ২০৪০ থেকে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত এই সুযোগটি বিদ্যমান থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই তরুণ এবং কর্মক্ষম। এই বিপুল সংখ্যক তরুণ সমাজই হতে পারে আগামীর উন্নত বাংলাদেশের মূল কারিগর।
সম্ভাবনার প্রধান ক্ষেত্রসমূহ
বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানোর বেশ কিছু সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে। বর্তমান বিশ্বের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। এই তরুণদের যদি উন্নত প্রশিক্ষণ এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে তথ্যপ্রযুক্তি খাত হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস। এছাড়া তরুণদের মধ্যে এখন চাকরির চেয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সৃজনশীল চিন্তা ও স্টার্টআপ সংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমে এই তরুণ জনগোষ্ঠী কেবল নিজের কর্মসংস্থান নয়, বরং অন্যদের জন্যও চাকরির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তবে তাদের সিংহভাগই অদক্ষ শ্রমিক। যদি এই তরুণদের দক্ষ কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিদেশে পাঠানো যায়, তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের কর্মশক্তি ব্যবহার করে পোশাক শিল্পের পাশাপাশি ঔষধ, ইলেকট্রনিক্স এবং অটোমোবাইল শিল্পে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। জাপানি বা দক্ষিণ কোরীয় মডেলে শিল্পায়নের পথে হাঁটলে কর্মক্ষম এই বিশাল জনগোষ্ঠী জাতীয় জিডিপিতে অভাবনীয় অবদান রাখবে।
চ্যালেঞ্জ ও অন্তরায়সমূহ
সম্ভাবনা থাকলেও পথের বাধাগুলো একেবারে কম নয়। বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, দক্ষতার অভাব। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও সনদসর্বস্ব। বাজার চাহিদার সাথে শিক্ষার কোনো যোগসূত্র নেই। ফলে উচ্চ শিক্ষিত বেকার বাড়ছে, অথচ টেকনিক্যাল কাজের জন্য আমাদের বিদেশিদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দ্বিতীয় গুরুতর সমস্যাটি হচ্ছে কর্মসংস্থানের মন্থর গতি। প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু সেই তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। শেষ সমস্যাটি হচ্ছে ‘ডিজিটাল ডিভাইড’। শহর এবং গ্রামাঞ্চলের মধ্যে প্রযুক্তির সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে এক বিশাল বৈষম্য রয়ে গেছে, যা গ্রামীণ তরুণদের পিছিয়ে দিচ্ছে।
সাফল্যের রোডম্যাপ: কী করা উচিত?
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই সুযোগ বারবার আসে না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উন্নত রাষ্ট্র হতে হলে আমাদের দ্রুততার সাথে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কোডিং, ডাটা অ্যানালাইটিক্স, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বাস্তবমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তরুণদের সৃজনশীল আইডিয়াগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। আমাদের কর্মক্ষম জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। নারীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে তাদের মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করা ছাড়া ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের পূর্ণ স্বাদ নেওয়া অসম্ভব।
জনমিতিক লভ্যাংশের এই জানালা ২০৪০ সালের পর ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করবে। তখন বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং নির্ভরশীলতার অনুপাত আবার বৃদ্ধি পাবে। তাই আমাদের হাতে সময় খুব বেশি নেই। আজ আমরা যে তরুণ প্রজন্মের ওপর দাঁড়িয়ে আগামীর স্বপ্ন দেখছি, তাদের সঠিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দক্ষতা নিশ্চিত করতে না পারলে এই ডিভিডেন্ড শেষ পর্যন্ত ‘ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার’ বা জনমিতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি পর্যায় থেকে যদি এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশ অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ার এক সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আমাদের জন্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নের এক বাস্তব ভিত্তি।