একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন ‘স্মার্ট’ সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের চারপাশের বাস্তবতায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। একদিকে শহরের একটি শিশু হাই-স্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোডিং শিখছে, অন্যদিকে গ্রামের এক মেধাবী শিক্ষার্থী কেবল একটি ভালো স্মার্টফোন বা স্থিতিশীল নেটওয়ার্কের অভাবে অনলাইন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই যে সুযোগের অসমতা, একেই সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ বা ডিজিটাল বিভাজন। এটি কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের পার্থক্য নয়, বরং এটি সুযোগ, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক বিশাল ব্যবধান।
ডিজিটাল ডিভাইড কী?
সহজ কথায়, ডিজিটাল ডিভাইড হলো সমাজের সেই অংশ যারা আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে পারে এবং সেই অংশ যারা তা পারে না, তাদের মধ্যকার ব্যবধান। এই ব্যবধান মূলত ভৌগোলিক অবস্থান (শহর বনাম গ্রাম), অর্থনৈতিক অবস্থা এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। বর্তমান বিশ্বে তথ্যই শক্তি, আর সেই তথ্যে প্রবেশাধিকারের এই বৈষম্য শহর ও গ্রামের মানুষের জীবনমানের পার্থক্যকে ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অবকাঠামোগত সংকট: গতির লড়াইয়ে পিছিয়ে গ্রাম
শহর ও গ্রামের প্রযুক্তিগত বৈষম্যের প্রধান কারণ হলো অবকাঠামো। বড় শহরগুলোতে এখন ফাইবার অপটিক ব্রডব্যান্ড সংযোগ হাতের নাগালে। অন্যদিকে, গ্রামের মানুষ এখনো মোবাইল ডেটার ওপর নির্ভরশীল। গ্রামে টাওয়ারের স্বল্পতা বা বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে ইন্টারনেটের গতি থাকে অত্যন্ত ধীর। হাই-ডেফিনিশন ভিডিও স্ট্রিমিং বা বড় ফাইল ডাউনলোড করা গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে এখনো এক বিলাসিতা। এই গতির পার্থক্য গ্রামের ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বাধা দেয়।
অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ও সরঞ্জামের অভাব
প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন ব্যয়বহুল সরঞ্জাম, যেমন- স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার। শহরের একটি সচ্ছল পরিবারের জন্য এগুলো কেনা সহজ হলেও গ্রামের নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি একটি বড় আর্থিক বোঝা। এছাড়া ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যও একটি বড় বাধা। একজন গ্রাম্য শ্রমিকের দৈনিক আয়ের বড় অংশ যদি কেবল ডেটা কিনতেই ব্যয় হয়ে যায়, তবে প্রযুক্তির সুফল তার কাছে পৌঁছাবে না। এই আর্থিক অসাম্যই ডিজিটাল বৈষম্যকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রভাব: এক অসম যুদ্ধ
করোনা মহামারীর সময় ডিজিটাল ডিভাইডের সবচেয়ে নগ্ন রূপটি ফুটে উঠেছিল। যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল, তখন শহরের শিক্ষার্থীরা জুম বা গুগল ক্লাসরুমের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। কিন্তু গ্রামের লাখ লাখ শিক্ষার্থী কেবল ডিভাইস বা ইন্টারনেটের অভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। গ্রামের অনেক শিক্ষক ও অভিভাবক এখনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে অভ্যস্ত নন, যার ফলে গ্রামের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শিখতে পারছে না।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য
ডিজিটাল ডিভাইডের কারণে গ্রামের তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগে পিছিয়ে পড়ছে। বর্তমানের চাকরির বাজারে কম্পিউটার জ্ঞান ও ইন্টারনেটে পারদর্শিতা আবশ্যিক। শহরের তরুণরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন স্কিল শিখে ঘরে বসেই আয় করছে, কিন্তু গ্রামের তরুণরা তথ্যের অভাবে সেই সুযোগগুলো চিনতে পারছে না। ই-কমার্স বা অনলাইন কেনাকাটার সুবিধা যেমন শহরের মানুষের জীবন সহজ করেছে, গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য সঠিক দামে অনলাইনে বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এটি সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্থবির করে দিচ্ছে।
বৈষম্য নিরসনে করণীয়
এই ডিজিটাল দেয়াল ভেঙে ফেলতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। গ্রাম পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে হবে এবং ডেটার দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে। গ্রামের স্কুলগুলোতে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য কিস্তিতে বা সরকারি ভতুর্কিতে ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোকে আরও শক্তিশালী করা যাতে গ্রামের মানুষ ঘরের কাছেই সব ধরনের ডিজিটাল সেবা পায়।
ডিজিটাল ডিভাইড কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি মানবাধিকারের প্রশ্নও বটে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে সমান প্রবেশাধিকার না থাকলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। আমরা যদি সত্যি একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়তে চাই, তবে প্রযুক্তির আলো কেবল শহরের অলিগলিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, তা পৌঁছে দিতে হবে দুর্গম পাহাড় আর প্রত্যন্ত গ্রামের কুঁড়েঘরেও। প্রযুক্তি যখন বিভাজনের দেয়াল না হয়ে মিলনের সেতু হবে, তখনই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে। শহর ও গ্রামের এই ব্যবধান ঘুচিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ গড়াই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।