একটা সময় ছিল, যখন সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে একচ্ছত্র সম্রাট ছিল টিকটক। কোটি মানুষের দিন শুরু হতো টিকটকের ভিডিও স্ক্রল দিয়ে, আর শেষ হতো অজস্র ট্রেন্ড আর বিনোদনের মাঝে। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতে হঠাৎই সেই রাজ্যে সন্দেহের ছায়া নামতে শুরু করে। অনেকেই বলছিলেন, রাজনৈতিক বা সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে পোস্ট করলে, ভিডিয়োর ভিউ কমে যাচ্ছে। কিছু পোস্ট মানুষের ফিডে পৌঁছাচ্ছে না, আবার কোথাও কোথাও পোস্টে ভিউজ একেবারে শূন্যের কোঠায়।
এই অভিযোগের ঢেউ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে #TikTokCensorship হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড হতে শুরু করে। অনেকেই দাবি করেন, ফিলিস্তিনপন্থী কনটেন্ট বা যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন সংস্থার বিরুদ্ধে সমালোচনা করলে ভিডিওগুলো রিচ পাচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে মিনিয়াপোলিসে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা। ওই ঘটনার ভিডিয়ো বা আলোচনা শেয়ার করতে গিয়ে কিছু ক্রিয়েটর অভিযোগ করেন, তাদের ভিডিয়ো স্বাভাবিকের তুলনায় মানুষ অনেক কম দেখছে, বা তাদের ফিডে যাচ্ছে না।
এদিকে টিকটক কর্তৃপক্ষ সরাসরি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বসে। তারা জানায়, ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু দমিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বক্তব্য, একটি বড়ো ডাটা সেন্টারে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সার্ভার সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে ভিডিও আপলোডে সমস্যা, ভিউ না দেখানো, ধীরগতির লোডিং, এসব প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিয়েছিল।
সন্দেহের দাবানল ততক্ষণে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাস্তবতা আর সন্দেহের মিশেলে চলতে থাকে এক অদ্ভুত সময়ের সীমারেখা।
ঠিক তখনই বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতে হঠাৎ করেই ঝড়ের বেগে এক নতুন নাম ছড়িয়ে পড়ে। তা হলো UpScrolled (আপস্ক্রল্ড)। ফিলিস্তিনি-জর্ডানীয়-অস্ট্রেলীয় উদ্যোক্তা ইসাম হিজাজির তৈরি এই অ্যাপটি খুব অল্প সময়েই নানা দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এর আগে তিনি ওরাকল, আইবিএমের মতো টেক জায়ান্টদের সাথে কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত সেই করপোরেট জগৎ ছেড়ে নিজের স্বপ্নের প্রকল্প গড়ে তোলার পথে হাঁটেন। এই উদ্যোগের পেছনে সমর্থন জুগিয়েছে ‘টেক ফর প্যালেস্টাইন’ নামে একটি অ্যাডভোকেসি প্রকল্প, যা ফিলিস্তিন-সম্পর্কিত প্রযুক্তি উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা দেয়।
বহু ইউজার এমন নতুন এক বিকল্প জায়গা খুঁজছিলেন, যেখানে তারা নিজেদের মতামত নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারবেন।
এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে এক বড় পরিবর্তন। টিকটকের মার্কিন অংশীদারিত্ব সম্প্রতি কিনে নিয়েছেন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলের মালিক ল্যারি ইলিসন। ইজরায়েলের জোরালো সমর্থক হিসেবে পরিচিত ল্যারির সঙ্গে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কথাও আলোচনায় এসেছে। এই পরিবর্তনের পর থেকেই কিছু ইউজারের মাঝে আশঙ্কা দেখা দেয়। তাদের আশঙ্কা ছিল, ফিলিস্তিন-সমর্থক পোস্টগুলো কি সেন্সরের মুখে পড়বে? সেই উদ্বেগ থেকেই অনেকেই ধীরে ধীরে নতুন প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন।
আপস্ক্রলের গঠনটা বেশ পরিচিত ও সহজ। এখানে ছবি, ছোট ভিডিও ও টেক্সট- তিন ধরনের পোস্টই করা যায়। এর ইন্টারফেস অনেকটা X-এর মতো, আবার কিছুটা ইনস্টাগ্রামের অনুভূতিও পাওয়া যায়। ব্যবহারকারীরা পোস্টে লাইক দিতে পারেন, মন্তব্য করতে পারেন, আবার শেয়ারও করতে পারেন।
অ্যাপটিতে “ডিসকভার পেজ” রয়েছে, যা অনেকটা স্ন্যাপচ্যাট ফিচারের মতো। সেখানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো ফিলিস্তিন। শত শত পোস্টে ভেসে উঠছে গাজা স্ট্রিপের চলমান দুর্ভোগ, অনেকে প্রকাশ করছেন সংহতি ও সমর্থন।
এই নতুন প্ল্যাটফর্মে যোগ দিয়েছেন কিছু পরিচিত মুখও। তাদের মধ্যে আছেন মার্কিন শ্রমিক অধিকারকর্মী ক্রিস স্মলস। তিনি আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলায় অংশ নিয়েছিলেন। একই উদ্যোগে অংশ নেওয়া অভিনেতা জ্যাকব বার্জারও এখানে সক্রিয় রয়েছেন, যিনি ব্লুকলিন নাইন-নাইন সিরিজে অভিনয় করে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
অল্প সময়ের মধ্যে অ্যাপটি অ্যাপলের অ্যাপস্টোরে বিনামূল্যের অ্যাপের তালিকার শীর্ষ দশে উঠে আসে। ২২ থেকে ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, এই মাত্র দু’দিনে এর ডাউনলোড বেড়ে যায় প্রায় ২,৮৫০ শতাংশ।
সংখ্যাগুলো যেন নীরব এক বিপ্লবের গল্প বলছিল। ২০২৫ সালের জুনে যাত্রা শুরুর পর থেকে ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৪ লাখ মানুষ অ্যাপটি ডাউনলোড করেছে, আর বিশ্বজুড়ে এই সংখ্যা পৌঁছেছে ৭ লাখের ঘরে। এরপর ২৯ জানুয়ারি, বিতর্ক আরও তীব্র হলে, আপস্ক্রলড অ্যাপ স্টোরে সর্বোচ্চ ডাউনলোড হওয়া অ্যাপে পরিণত হয়।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই ছোট্ট প্লাটফর্মটি এক দানবের গতিতে বড়ো হতে থাকে। ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নাগাদ এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫ লাখে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি, কানাডাতেও এটি হয়ে ওঠে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এছাড়াও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালিতেও দ্রুত বাড়তে থাকে আগ্রহ।
ইউজাররা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিলেন, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, টিকটকে ফিলিস্তিন-সমর্থক পোস্টে “শ্যাডো ব্যান” দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই আপস্ক্রল্ড নিজেকে আলাদাভাবে তুলে ধরতে চেয়েছে। তাদের দাবি, অবৈধ বিষয় যেমন, মাদক বিক্রির মতো কনটেন্ট ছাড়া অন্য কিছু তারা মডারেট করবে না। হিজাজির ভাষায়, এই অ্যাপের অ্যালগরিদম মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখার জন্য তৈরি নয়। এখানে ফিডে এমন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পাওয়া যাবে, যা অন্য প্লাটফর্মে ব্যান করা হয়েছে।
ফিড সময় অনুযায়ী সাজানো থাকবে, কোনো লুকানো অ্যালগরিদমে নয়। এরপর একসময় এই অ্যাপ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং বিভাগে এক নম্বরে উঠে গিয়ে থ্রেডস, হোয়াটসঅ্যাপ, এবং টিকটককে পেছনে ফেলে দেয়। একই সময়ে এটি গুগল প্লেতে ষষ্ঠ জনপ্রিয় ফ্রি সোশ্যাল অ্যাপে পরিণত হয়।
তবে ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে প্লে স্টোর থেকে এই অ্যাপ সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে কিছু সময় পর অ্যাপটি আবার প্লে স্টোরে পুনর্বহাল করা হয়।
স্থগিত করার নির্দিষ্ট কিছু কারণ হলো:
১. অ্যাপটির ইউজার সংখ্যা এক সপ্তাহেরও কম সময়ে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে লাফ দিয়ে কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে যায়। এত বিপুল পরিমাণ ব্যবহারকারীর তৈরি কনটেন্ট পরিচালনা করা তাদের টিমের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
২. ইউজার বৃদ্ধির ফলে এমন অনেক কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ে, যা কমিউনিটি নীতিমালা ভঙ্গ করছিল। ক্ষতিকর বা নিষিদ্ধ কন্টেন্টের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল।
৩. “সেন্সরশিপমুক্ত” প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরলেও, বেআইনি কনটেন্ট সরানোর আইনি দায়িত্ব ছিল তাদের ওপরই। শুরুতে এই লক্ষ্য ও আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে তারা হিমশিম খায়।
৪. হঠাৎ বিপুল সংখ্যক ইউজার যুক্ত হওয়ায় সার্ভার ক্র্যাশ ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দেয়, যা সাময়িক স্থগিতের পেছনে ভূমিকা রাখে।
পরবর্তীতে হালনাগাদ সম্পন্ন করার পর অ্যাপটি আবার গুগল প্লে স্টোরে ফিরিয়ে আনা হয়।
এই গল্প শেষ পর্যন্ত কোনো অ্যাপের উত্থান–পতনের নয়, এটি মানুষের আস্থা স্থানান্তরের গল্প। আপস্ক্রলড সেই শূন্যতাতেই জায়গা করে নিয়েছে, প্রমাণ করেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার আসল শক্তি অ্যালগরিদম নয়, তা হলো বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস হারালে, সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের পতন হয়।