Ridge Bangla

‘টার্গেট কিলিং’ নাকি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? রাজপথে বাড়ছে রাজনৈতিক লাশের মিছিল

বাংলাদেশ বর্তমানে এক অস্থির ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ওপেন টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব হামলার ধরন প্রায় একই রকম। দিন-দুপুরে বা জনাকীর্ণ এলাকায় দুর্বৃত্তরা হঠাৎ এসে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড জনমনে গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এসব ঘটনার নেপথ্যে কারা? এটি কি বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি সুপরিকল্পিত কোনো নেটওয়ার্কের অংশ?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার তদন্ত চলমান রয়েছে। বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসে খুব কাছ থেকে, বিশেষ করে মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য ও জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালালেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করাও দুরূহ হয়ে পড়ছে।

হামলার ধরন ও ঘাতকদের পালানোর কৌশল বিশ্লেষণ করে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ঘটনা যেন একটি সুপরিকল্পিত ছকের অংশ। হামলাকারীরা আগে থেকেই ভিকটিমের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে ওঁৎ পেতে থেকে মোক্ষম সময়ে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালাচ্ছে। একের পর এক এমন ঘটনার ধারাবাহিকতায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর দ্বিতীয় পর্যায় (ফেজ-২) শুরু করা হয়।

সর্বশেষ এ ধরনের হামলায় ৩ জানুয়ারি যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এর আগে ১২ ডিসেম্বর মোটরসাইকেলযোগে আসা সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদী। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়ার পর তিনি ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। রাজধানীর মিরপুরে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে গত ১৭ নভেম্বর দোকানের ভেতরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

৯ ডিসেম্বর রাতে কক্সবাজারে মোটরসাইকেলে হেলমেট পরে আসা সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন যুবদল নেতা মো. ফারুক। হামলার ১৮ দিন পর ২৮ ডিসেম্বর মৃত্যু হয় ফারুকের। ওই একই হামলায় গুরুতর আহত হওয়া যুবদলের আরেক নেতা সাইফুল ইসলাম এখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগকালে গোলাগুলির ঘটনায় সরোয়ার হোসেন বাবলা নিহত হন এবং এতে আহত হন এরশাদ উল্লাহ নিজেও। রাঙ্গুনিয়ায় শ্রমিক দল নেতা আব্দুল মান্নানসহ আরও অনেকে এভাবে আচমকা বন্দুকধারীদের নিশানায় পরিণত হয়েছেন। এসব ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

এর পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বাইরেও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সন্ত্রাসীদের দ্বন্দ্বে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। গত ৩০ নভেম্বর খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে হাজিরা দিতে আসা মো. ফজলে রাব্বি (রাজন) ও হাসিব হাওলাদার নিহত হন। তাদের নামেও রয়েছে একাধিক মামলা। ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও নিয়মিত নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে স্পষ্টতই একধরনের পেশাদারিত্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে হামলা চালিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল ইঙ্গিত দেয় যে, এটি কোনো অপেশাদার অপরাধীর কাজ নয়, বরং সংগঠিত ও প্রশিক্ষিত গোষ্ঠী এতে জড়িত থাকতে পারে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দেশজুড়ে অরাজকতা সৃষ্টির পরিকল্পনার অভিযোগে পৃথক দুটি মামলায় সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া মেজর মো. সাদিকুল হক ও তার স্ত্রী সুমাইয়া তাহমিদ যাফরিনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। এই ঘটনা দেশজুড়ে চলমান সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা যে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তাদের পলাতক দলীয় নেতৃবৃন্দ দেশের অভ্যন্তরে নানা ধরনের অরাজকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। এই লক্ষ্যেই ফেব্রুয়ারিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারা এখন আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠতে চেষ্টা করছে। এর ধারাবাহিকতায় সংবাদমাধ্যমে আসে এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার চেক দেওয়ার খবর। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ থেকে অবৈধ অস্ত্রের চালান এবং সুব্রত বাইনদের মতো পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফের দেশে এনে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টাও এই একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনের বিকল্প নেই। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশ থেকে পলাতক পতিত স্বৈরাচারী শক্তি তাদের পূর্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার জন্য নির্বাচনকে নস্যাৎ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ও অর্থ ব্যবহার করে তারা যেকোনো পক্ষকে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতায় উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এসবের পাশাপাশি স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও সামাজিক দ্বন্দ্বও এ ধরনের ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

This post was viewed: 91

আরো পড়ুন