Ridge Bangla

ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন কীভাবে পাল্টে দিচ্ছে বিশ্ব ভূ-রাজনীতির হিসাব-নিকাশ

​একুশ শতকের রণক্ষেত্রে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বিপ্লব ঘটে গেছে। গত কয়েক দশক ধরে সামরিক শক্তির মাপকাঠি ছিল বিশাল ট্যাংক বহর, শক্তিশালী বিমানবাহিনী কিংবা পরমাণু শক্তিচালিত রণতরী। কিন্তু ইউক্রেনের কাদাটে মাঠ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমি- সর্বত্রই এখন একটি ছোট উড়ন্ত ডিভাইসের জয়জয়কার দেখা যাচ্ছে, যা মুহূর্তেই কয়েক মিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটি হলো ‘ড্রোন’ বা আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (UAV)। বিশেষ করে ড্রোনের ‘সোয়ার্ম’ বা ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করার ক্ষমতা প্রথাগত সামরিক ডকট্রিনকে আক্ষরিক অর্থেই জাদুঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

প্রথাগত সামরিক ডকট্রিনের সংকট

​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বড় দেশগুলোর সামরিক কৌশল ছিল ‘হেভি মেটাল’ বা ভারী সমরাস্ত্র নির্ভর। ট্যাংককে মনে করা হতো যুদ্ধের রাজা। কিন্তু নাগরনো-কারাবাখ যুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে দেখা গেছে, তুর্কি ‘বায়রাক্তার টিবি-২’ বা সাধারণ ‘এফপিভি’ (First Person View) ড্রোন কীভাবে রুশ বা পশ্চিমা দামী ট্যাংকগুলোকে খেলনার মতো ধ্বংস করছে। এখানে কয়েক হাজার ডলারের একটি ড্রোন কয়েক মিলিয়ন ডলারের ট্যাংকের সুরক্ষাবলয় গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। একে সামরিক ভাষায় বলা হচ্ছে ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (Asymmetric Warfare)। যখন যুদ্ধের খরচ এবং কার্যকারিতার ব্যবধান এত বেশি হয়ে যায়, তখন প্রথাগত দামী ডকট্রিনগুলো তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়।

ড্রোন সোয়ার্ম: আগামীর বিভীষিকা

​একক ড্রোনের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ বা ড্রোনের ঝাঁক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে শত শত ছোট ড্রোন যখন একসাথে আক্রমণ করে, তখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও (যেমন এস-৪০০ বা প্যাট্রিয়ট) দিশেহারা হয়ে পড়ে। কারণ, এই ড্রোনগুলো একসাথে এত বেশি লক্ষ্যবস্তু তৈরি করে যে, রাডার সেগুলোকে আলাদা করতে পারে না এবং সবগুলোকে ধ্বংস করার মতো ইন্টারসেপ্টর মিসাইল কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছেই থাকে না। এটি কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং গণিত এবং প্রযুক্তির লড়াই।

আকাশসীমার ‘উন্মুক্তকরণ’ ও ভূ-রাজনীতি

​ড্রোন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিশ্ব ভূ-রাজনীতির শক্তিসাম্যে। আগে কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার মতো পরাশক্তির হাতেই কার্যকর বিমানবাহিনী ছিল। ড্রোন এখন আকাশপথকে উন্মুক্ত করে ফেলেছে। এখন তুরস্ক, ইরান বা এমনকি অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোও (যেমন হুথি বিদ্রোহী) ড্রোন ব্যবহার করে দূরপাল্লার নির্ভুল হামলা চালাতে পারছে। ​হুথিরা যখন কয়েকশ মাইল দূর থেকে ড্রোনের মাধ্যমে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলা চালায় বা লোহিত সাগরে পশ্চিমা জাহাজে আঘাত হানে, তখন তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের কম্পন তৈরি করে। এর ফলে পরাশক্তিগুলো এখন আর ছোট দেশ বা গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করতে পারছে না। ড্রোনের সহজলভ্যতা ছোট দেশগুলোকে এক ধরণের ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধ ক্ষমতা দান করেছে, যা আগে ছিল অকল্পনীয়।

অর্থনৈতিক ও কৌশলী মোড়

​যুদ্ধের অর্থনীতি এখন বদলে গেছে। একটি শক্তিশালী ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় এবং বিলিয়ন ডলার লাগে। কিন্তু কয়েক মাসেই হাজার হাজার ড্রোন তৈরি করা সম্ভব। ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ থ্রি-ডি প্রিন্টার ব্যবহার করে ড্রোনের যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। এর ফলে যুদ্ধের স্থায়িত্ব বাড়ছে এবং বড় শক্তির দেশগুলোকেও সাধারণ ড্রোনের সামনে দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তিকর লড়াইয়ে লিপ্ত হতে হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন থেকে যুদ্ধের মানদণ্ড কেবল ‘কে কত বড় বোমা মারল’ তা নয়, বরং ‘কে কত কম খরচে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করল’ তার ওপর নির্ভর করবে।

পরাশক্তিদের উদ্বেগ ও আগামীর প্রস্তুতি

​এই ড্রোনের দাপট দেখে বিশ্বের সামরিক পরাশক্তিগুলো এখন তাদের রণকৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিশাল রণতরীগুলোকে ড্রোনের হাত থেকে বাঁচাতে ‘লেজার ডিফেন্স সিস্টেম’ নিয়ে কাজ করছে। রাশিয়া ও চীন ড্রোনের পাল্টা জ্যামিং প্রযুক্তি বা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার উন্নত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। পদাতিক বাহিনীতে এখন বড় ট্যাংকের বদলে ড্রোন বিধ্বংসী জ্যামার গান বা নেট গান অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রথাগত ডকট্রিন থেকে সরে এসে সবাই এখন ‘ড্রোন-কেন্দ্রিক’ যুদ্ধের দিকে ঝুঁকছে।

নৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ

​তবে এই ড্রোন বিপ্লব কিছু গভীর নৈতিক প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন সিদ্ধান্ত নেয় কাকে হত্যা করতে হবে, তখন সেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। স্বয়ংক্রিয় ঘাতক ড্রোন যদি ভুলবশত বেসামরিক নাগরিক হত্যা করে, তবে তার দায় কে নেবে? এছাড়া সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীদের হাতে এই প্রযুক্তি যাওয়ার ঝুঁকি বিশ্ব নিরাপত্তাকে নতুন এক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​ড্রোনের উত্থান কেবল একটি প্রযুক্তির বিবর্তন নয়, এটি সামরিক ইতিহাসের একটি মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায়। এটি প্রমাণ করেছে যে, কেবল আকার বা শক্তিতে বড় হলেই যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না; বরং যে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে, সেই টিকে থাকবে। প্রথাগত সামরিক ডকট্রিন যে মারা গেছে, তা আজ রণক্ষেত্রের ধ্বংসপ্রাপ্ত ট্যাংক আর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষই বলে দিচ্ছে। বিশ্ব ভূ-রাজনীতি এখন ড্রোনের ডানায় ভর করে এক অনিশ্চিত কিন্তু অত্যন্ত কৌশলী ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন