Ridge Bangla

জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই: সরকারি আশ্বাসের বিপরীতে মাঠে তীব্র সংকট, হাহাকার

সরকারি ঘোষণায় দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই- এমন দাবি বারবার শোনা গেলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা এবং অনেক ক্ষেত্রে তেল না পাওয়ার ঘটনা জনদুর্ভোগকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে। ফলে সরকারি বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, তেল সংগ্রহের জন্য ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চালকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশন, আসাদগেট তালুকদার ফিলিং স্টেশন, সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন, পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশন ও পূর্বাচল ফুয়েল স্টেশন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক চালক রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নির্ধারিত সময়ে তেল পাননি।

বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশনে দেখা যায়, গাড়ির লাইন মহাখালী পর্যন্ত বিস্তৃত। দুপুর পর্যন্ত তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় চালকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করে। খিলক্ষেত থেকে রাত ৩টায় এসে লাইনে দাঁড়ানো এক চালক জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যায়নি। একইভাবে বাড্ডা থেকে আসা আরেক চালক বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তিনি তেল পাননি।

যমুনা ফুয়েল স্টেশনের এক কর্মচারী জানান, সকাল থেকেই তেল সরবরাহ শুরু হলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় লাইনের দৈর্ঘ্য ক্রমেই বাড়ছে। অনেক স্টেশনে তেল সংকটে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে।

অন্যদিকে, সরকারি তথ্য বলছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে। ১ এপ্রিলের হিসাবে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন, অকটেন ৯ হাজার ২১ টন এবং পেট্রোল ১২ হাজার ১৯৪ টন। দৈনিক চাহিদা অনুযায়ী এসব মজুত দিয়ে যথাক্রমে ১০, ৮ ও ৯ দিন চলার সক্ষমতা রয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দাবি করেছেন, দেশে কোনো ধরনের জ্বালানি সংকট নেই এবং সরকার তিন মাসের আগাম পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তবে মাঠপর্যায়ে এই দাবির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে, জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে সরকার আমদানির ওপর জোর দিয়েছে। সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেল নিয়ে ‘এমটি ইউয়ান জিং হে’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। মালয়েশিয়া থেকেও আরও একটি ডিজেলবাহী জাহাজ বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এছাড়া এলএনজি ও এলপিজিবাহী জাহাজও বন্দরে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হলেও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ানো হয়েছে।

সংকটের পেছনে অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির বিষয়টিও উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকায় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর যৌথ অভিযানে একটি ট্যাংকার থেকে ৩৭ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়েছে। একইভাবে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে একটি বাড়ির পানির ট্যাংকে লুকিয়ে রাখা ৭৫০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে।

খুলনায়ও তিনটি ভ্যানে করে অবৈধভাবে তেল পরিবহনের সময় তা জব্দ করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সরকার বলছে, অবৈধ মজুত ও বাজার অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী অভিযান চালানো হচ্ছে। মার্চ মাসে ৩ লাখ ৭২ হাজার টন জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে, যা প্রায় ২৫ দিনের চাহিদার সমান।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু অভিযান নয়, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। না হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি খাতে বর্তমান পরিস্থিতি এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করেছে। সরকারি আশ্বাস সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে তেল সংকটের চিত্র জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও প্রকট হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

This post was viewed: 7

আরো পড়ুন