Ridge Bangla

জুয়ার মরণনেশায় স্বপ্নভঙ্গ তারুণ্যের, নিঃস্ব হচ্ছে শ্রমজীবী পরিবার

ঢাকার হাজারীবাগের বাসিন্দা আজগর (ছদ্মনাম) একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ব্যক্তিগত গাড়ির চালক। সকালে গাড়ি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর বিকেল অব্দি থাকেন সম্পূর্ণ ফ্রি। এই ফ্রি সময়ে তার কাজ অনলাইনে কিংবা বিভিন্ন চায়ের দোকানে বসে বেটিং বা জুয়া খেলা।

সন্ধ্যায় ডিউটি শেষ হওয়ার পর বাসায় না ফিরে তিনি গভীর রাত অব্দি বাইরে থেকে বিভিন্নজনের সঙ্গে জুয়ায় মেতে থাকেন। মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতনের টাকা অগ্রিম নিতে হয়। কারণ জুয়ায় হেরে তিনি এখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত। এভাবে বেটিংয়ে টাকা হেরে যাওয়ায় বাসায় ঠিকঠাক বাজার করা হচ্ছে না, ঘরভাড়া, বাচ্চাদের স্কুল খরচসহ নানা দিকের চাপে তিনি হয়ে পড়েছেন মাদকাসক্ত।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বন্ধুদের সঙ্গে হোস্টেলে বসে মজার ছলে কয়েকদিন আইপিএল ম্যাচে চা-সিঙারা বাজি ধরে এখন নেশায় আটকে হয়ে উঠেছেন সর্বশান্ত। পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে, অভাবে হোস্টেল ছেড়ে গ্রামে এসে থাকছেন তিনি। অনার্স যে শেষ হয়নি, তা পরিবার জানে না। এই গল্পগুলো আজ কেবল একজনের নয়, বরং বাংলাদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। জুয়া নামক এই মরণব্যাধি দেশের তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষের সাজানো সংসার তছনছ করে দিচ্ছে।

তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিপিএল, আইপিএল বা বিগব্যাশের মতো বড় ক্রিকেট আসরগুলো শুরু হলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে জুয়াড়ি চক্র। মেসের আড্ডা বা স্মার্টফোনের অ্যাপে শুরু হওয়া এই বাজি একসময় মাদকাসক্তির চেয়েও ভয়াবহ রূপ নেয়।

অনেকেই পরিবারের জমি বিক্রির টাকা বা অসুস্থ স্বজনের চিকিৎসার টাকা পর্যন্ত জুয়ায় হেরে যাচ্ছেন। সামাজিক লোকলজ্জা আর ঋণের চাপে অনেক ক্ষেত্রে এই জুয়ারিরা জড়িয়ে পড়ছেন চুরি, ছিনতাই বা মাদক ব্যবসার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

এমনকি ঋণের দায়ে মারধর বা অপমানের শিকার হয়ে আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। কেবল শিক্ষার্থী নয়, এই আগুনের আঁচ লেগেছে নিম্নআয়ের মানুষের ঘরেও।

রিকশাচালক থেকে শুরু করে সেলুন কর্মী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী- সবাই এই দ্রুত বড়লোক হওয়ার হাতছানিতে পা দিচ্ছেন। রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার দোকান বা সেলুনে ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে চলছে টাকার লেনদেন। স্ত্রীকে দেওয়া গয়না বিক্রি কিংবা গৃহপালিত পশু বন্ধক রেখে জুয়ার দেনা শোধ করতে হচ্ছে অনেককে।

ঘরোয়া অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ বা পারিবারিক কলহের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অনৈতিক জুয়া। বর্তমানে এই সংকটকে আরও গভীর করেছে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট। বিদেশি বিভিন্ন বেটিং সাইট ও মোবাইল অ্যাপের চটকদার বিজ্ঞাপন সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করছে।

সরকারি হিসেবে দেশে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ কোনো না কোনোভাবে জুয়ায় আসক্ত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ইতিমধ্যে হাজার হাজার জুয়ার সাইট ও অ্যাপ বন্ধ করার উদ্যোগ নিলেও ভিপিএনের মাধ্যমে এখনো সক্রিয় রয়েছে এসব প্ল্যাটফর্ম। গুগল, ফেসবুক ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মেও প্রচারণার কারণে দিনদিন জুয়া ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, জুয়া কেবল একটি আইনি অপরাধ নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। কর্মসংস্থানের অভাব এবং নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয় এই নেশাকে উসকে দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তানদের প্রতি কড়া নজরদারি ছাড়া এই মহামারি রোধ করা সম্ভব নয়।

This post was viewed: 32

আরো পড়ুন