Ridge Bangla

চট্টগ্রামের ওয়ার সিমেট্রি: বিশ্বযুদ্ধের নীরব সাক্ষী

চট্টগ্রামের দামপাড়ায় অবস্থিত ‘চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি’ বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ। এটি কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশনের (সিডব্লিউজিসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি স্মৃতিসৌধ, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিহত যোদ্ধাদের স্মৃতিরক্ষার জন্য নির্মিত। চট্টগ্রাম শহরের ওয়েল পার্ক রেসিডেন্স থেকে খুব কাছেই, দামপাড়ার ১৯ নম্বর বাদশা মিয়া সড়কে, এটি অবস্থিত।

দুই বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্রিটিশ সেনাদের প্রায় ১৭ লাখ নিহত সদস্যের স্মৃতি রক্ষার্থে সিডব্লিউজিসি কাজ করে যাচ্ছে। এটি ১৫০টি দেশের প্রায় ২৩ হাজার স্থানে সমাধি ও স্মৃতিসৌধ পরিচালনা করে। স্যার ফেবিয়ান ওয়্যার, ব্রিটিশ রেড ক্রসের এক কর্মকর্তা, তার নিরলস প্রচেষ্টায় এই কমিশন প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের তিনটি স্থানে সিডব্লিউজিসি সমাধি পরিচালনা করছে, যার মধ্যে চট্টগ্রামের দামপাড়া অন্যতম।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী দামপাড়ার একটি নির্জন এলাকায় এই সিমেট্রি তৈরি করে। প্রথমে ৪০০ সদস্যের সমাধি নিয়ে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৭৫৫-তে পৌঁছায়। চন্দ্রঘোনা, চিরিঙ্গা, দোহাজারী, কক্সবাজার, যশোর, খুলনা, ঢাকা, এমনকি আসাম থেকেও সমাধি স্থানান্তরিত হয় এখানে। প্রতিটি সমাধিফলকে একই আকার ও আকৃতিতে নাম, রেজিমেন্ট এবং দেশের নাম উৎকীর্ণ রয়েছে। কিছু সমাধিফলকে পরিবারের অনুরোধে পবিত্র কোরআনের আয়াত, বাইবেল থেকে উদ্ধৃত বাণী কিংবা প্রিয় কবিতার লাইনও সংযোজন করা হয়েছে।

সিমেট্রির ভেতরে প্রবেশের পর সরু পথ দিয়ে সারি সারি সমাধিফলক দেখা যায়। এই সিমেট্রিতে ৫২৪ জন সৈনিক, ১৯৮ জন বৈমানিক এবং ১৩ জন নাবিকের সমাধি রয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৭৮ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক, ২১৪ জন অবিভক্ত ভারতের এবং ৯০ জন পশ্চিম আফ্রিকার। এছাড়া কানাডা, পূর্ব আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরাও এখানে সমাহিত আছেন।

প্রবেশপথের ডান পাশে একটি ছোট কক্ষে রেজিস্টারে ১৯৩৯-৪৫ সাল পর্যন্ত সাগরে নিহত নাবিকদের নাম সংরক্ষিত রয়েছে। ঐ সময় সাগরে মৃত্যুবরণ করা ভারতীয় রয়্যাল নেভি ও ভারতীয় মার্চেন্ট নেভির প্রায় ৬,৫০০ সদস্যের স্মরণে দুটি রেজিস্টার তৈরি করা হয়েছে। একটি রেজিস্টার চট্টগ্রামে সংরক্ষিত, অপরটি মুম্বাইয়ের ইন্ডিয়ান সিম্যান হোমে রাখা আছে।

সিমেট্রিতে প্রবেশপথের পাশে বোর্ডে পরিষ্কারভাবে লেখা থাকে করণীয় ও বর্জনীয় কার্যাবলির তালিকা, যাতে দর্শনার্থীরা সমাধিস্থলের পবিত্রতা বজায় রাখেন। সিমেট্রিটি দেখতে কেউ কোনো টিকিট ছাড়াই যেতে পারেন। এটি প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা এবং দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

চট্টগ্রামের এই সিমেট্রি এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবস্থিত, যেখানে বসার স্থান, খাবারের ব্যবস্থা, হকার বা ভিক্ষুকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এখানে দর্শনার্থীরা নিঃশব্দে নিহত যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। সিমেট্রির সবুজ চত্বরে বিশাল গাছগুলো পরিবেশকে আরও সুন্দর করে তুলেছে।

চট্টগ্রামের ওয়ার সিমেট্রি প্রকৃতপক্ষে কোনো পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এটি এমন এক স্থান যেখানে বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া সৈনিকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বের ইতিহাসেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

This post was viewed: 9

আরো পড়ুন