মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ একটি বহুল আলোচিত, বিতর্কিত এবং রহস্যঘেরা শব্দ। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক ও ধর্মীয় সংকল্প যা দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলের সংঘাতকে ইন্ধন দিয়ে আসছে। সম্প্রতি ইসরায়েলের বর্তমান মন্ত্রিসভার কিছু সদস্যের বক্তব্য এবং চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি পুনরায় বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ভিত্তি: প্রতিশ্রুত ভূমি
‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার মূল ভিত্তি মূলত হিব্রু বাইবেলের কিছু শ্লোকের ওপর দাঁড়িয়ে। বাইবেলের ‘জেনেসিস’ (Genesis 15:18) অধ্যায়ে উল্লেখ রয়েছে যে, খোদা ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশধরদের জন্য একটি ভূমি প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে, “মিশরের নীল নদ থেকে শুরু করে মহান ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল তোমাদের দান করা হলো।”
এই ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’ বা ‘প্রমিজড ল্যান্ড’-এর সীমানা নিয়ে ধর্মীয় পণ্ডিতদের মধ্যে নানা মতভেদ থাকলেও, কট্টরপন্থী জায়নবাদীরা একে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক মানচিত্র হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্রটি এই বিশাল ভূখণ্ডের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো- পুরো প্রতিশ্রুত ভূমিকে ইহুদি শাসনের অধীনে আনা।
নীল থেকে ফোরাত: ভৌগোলিক আকাঙ্ক্ষা
তত্ত্বগতভাবে, গ্রেটার ইসরায়েলের মানচিত্রটি অত্যন্ত বিশাল। এটি বর্তমান ইসরায়েল ছাড়াও ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর (জুডিয়া ও সামারিয়া), গাজা উপত্যকা, জর্ডান, দক্ষিণ লেবানন, সিরিয়ার একটি বড় অংশ, ইরাকের পশ্চিম অঞ্চল এবং মিশরের সিনাই উপদ্বীপের কিছু অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে। এমনকি সৌদি আরবের উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশকেও এই মানচিত্রের ভেতরে কল্পনা করেন অনেক কট্টরপন্থী।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জায়নবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা জেভ জাবোতিনস্কি এবং তার অনুসারী জায়নবাদীরা স্পষ্টভাবেই জর্ডান নদীর দুই তীরের ভূখণ্ড নিয়ে একটি ইহুদি রাষ্ট্রের দাবি তুলেছিলেন। যদিও ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সীমানা কিছুটা সীমিত ছিল, কিন্তু ১৯৬৭ সালের ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ (Six-Day War)-এ ইসরায়েলের ব্যাপক ভূমি দখল এই আকাঙ্ক্ষাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
রাজনৈতিক বাস্তবায়ন ও বসতি স্থাপন
১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল যখন পশ্চিম তীর, গাজা, গোলান মালভূমি এবং সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নেয়, তখন ধর্মীয় ও ডানপন্থী দলগুলো একে ‘ঈশ্বরের অলৌকিক সংকেত’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। এরপর থেকেই শুরু হয় ‘সেটেলমেন্ট’ বা অবৈধ বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া। বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বাস করেন। ইসরায়েলের বর্তমান দক্ষিণপন্থী সরকার, বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডের সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার (Annexation) কথা বলছেন। তারা বিশ্বাস করেন, এটি কোনো ‘দখলদারিত্ব’ নয়, বরং এটি তাদের পিতৃপুরুষের ভূমিতে ফিরে আসা। তাদের ভাষায়, “পুরো ভূমিই আমাদের।”
জাতীয় পতাকার রহস্য ও প্রতীকবাদ
গ্রেটার ইসরায়েলকে ঘিরে একটি বহুল প্রচলিত তত্ত্ব হলো ইসরায়েলের জাতীয় পতাকার নকশা। পতাকার নীল রঙের দুটি রেখাকে অনেকেই নীল নদ এবং ফোরাত নদী হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। যদিও ইসরায়েল সরকার এবং মূলধারার জায়নবাদীরা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে, এই নীল রেখা দুটি মূলত ইহুদিদের প্রার্থনার চাদর ‘তালিত’ (Tallit)-এর নকশা থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষ এবং অনেক বিশ্লেষক এই নীল রেখাকে ইসরায়েলের প্রসারণবাদী (Expansionist) মানসিকতার প্রতীক হিসেবেই দেখেন।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও আঞ্চলিক ভীতি
’গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণাটি কেবল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জর্ডান, সিরিয়া এবং ইরাকের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এক গভীর আতঙ্কের কারণ। যখনই ইসরায়েল তার সীমানা বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দেয়, তখনই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একে অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
বিশেষ করে ইসরায়েল যখন গোলান মালভূমিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে, তখন সিরিয়া ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেয়। ফিলিস্তিনের দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান (Two-State Solution) থমকে যাওয়ার প্রধান কারণও হলো এই ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ আকাঙ্ক্ষা। কারণ, যদি ইসরায়েল পুরো পশ্চিম তীরকে নিজের অংশ করে নেয়, তবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য কোনো ভূখণ্ডই অবশিষ্ট থাকবে না।
খ্রিস্টান জায়নবাদের ভূমিকা
মজার বিষয় হলো, গ্রেটার ইসরায়েলের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমেরিকার ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টানরা অনেক সময় ইহুদিদের চেয়েও বেশি উৎসাহী থাকে। তাদের ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাস মতে, ইহুদিরা যদি তাদের প্রতিশ্রুত ভূমিতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তবেই যিশু খ্রিস্টের দ্বিতীয় আগমন ত্বরান্বিত হবে। এই বিশ্বাসের কারণেই আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েলকে শর্তহীন সমর্থন দেওয়ার একটি শক্তিশালী লবি কাজ করে। তারা মনে করে, ইসরায়েলের সীমানা বৃদ্ধি পাওয়া মানে হলো বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া।
’গ্রেটার ইসরায়েল’ কেবল একটি মানচিত্র নয়, এটি একটি শক্তিশালী ধর্মীয় ভিত্তির উপর নির্মিত পরিকল্পনা। কেউ একে দেখেন ধর্মের নামে ভূমি দখলের নীল নকশা হিসেবে, আবার কেউ দেখেন কয়েক হাজার বছরের নির্বাসন শেষে নিজ দেশে ফিরে আসার আধ্যাত্মিক পূর্ণতা হিসেবে। তবে বর্তমান আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় এই প্রসারণবাদী স্বপ্ন মধ্যপ্রাচ্যকে এক চিরস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত মানচিত্রের সীমানা নিয়ে এই লড়াই চলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তির পায়রা এই অঞ্চলে ডানা মেলতে পারবে না। গ্রেটার ইসরায়েলের এই আকাঙ্ক্ষা একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জটিল ও অমীমাংসিত ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।