মরুভূমির নিস্তব্ধ বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিস্ময়কর শহর পেত্রা। হাজার বছরের ইতিহাস বয়ে চলা এই নগরী একসময় ছিল সমৃদ্ধি, প্রযুক্তি আর বাণিজ্যের এক অনন্য কেন্দ্র। আজ তা ধ্বংসস্তূপ, কিন্তু প্রতিটি পাথর যেন এখনো গল্প বলে- উত্থান, পতন আর সময়ের নির্মমতার গল্প।
প্রায় ২৩০০ বছর আগে নাবাতিয়ান নামে এক আরব জাতিগোষ্ঠী জর্ডানের পাহাড় কেটে গড়ে তোলে এই বিস্ময়কর নগরী। চারদিকে ছিল অনাবাদি মরুভূমি, কিন্তু পেত্রার ভেতরে ছিল জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু। বিশেষ করে পানির ব্যবস্থাপনা ছিল তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। পাহাড় কেটে তৈরি করা চ্যানেল, ড্যাম ও রিজার্ভারের মাধ্যমে তারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করত। মরুভূমির মধ্যে এমন উন্নত জলব্যবস্থা সেই সময়ের জন্য ছিল অভাবনীয়।
এই পানির ওপর নির্ভর করেই পেত্রা হয়ে ওঠে এক বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্র। আরব, মিসর ও রোমান সাম্রাজ্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি ছিল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। মসলা, রেশম, সুগন্ধি, স্বর্ণ- বিভিন্ন মূল্যবান পণ্যের লেনদেনে পেত্রা ছিল প্রাণচঞ্চল। দূরদূরান্ত থেকে বণিকরা আসত এই শহরে, আর সেই সঙ্গে বাড়ত এর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব।
পেত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর স্থাপত্যশৈলী। পুরো শহর খোদাই করা হয়েছে গোলাপি-লাল বালুকাপাথরের পাহাড়ে। সূর্যের আলোয় এই পাথরের রঙ বদলে যায়; ভোরে গোলাপি, দুপুরে গাঢ় লাল আর সন্ধ্যায় সোনালি আভা ছড়িয়ে দেয়। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই পেত্রাকে বলা হয় ‘গোলাপি পাথরের শহর’। প্রকৃতি ও মানুষের যৌথ সৃষ্টির এই নান্দনিকতা আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
তবে ইতিহাসের নিয়মই হলো পরিবর্তন। পেত্রার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রোমান সাম্রাজ্য এই নগরী দখল করে নেয়। এরপর ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে বাণিজ্যের ধারা। স্থলপথের পরিবর্তে সমুদ্রপথ সহজ ও নিরাপদ হয়ে ওঠে। ফলে পেত্রার গুরুত্ব কমতে শুরু করে।
এরপর আসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। ৩৬৩ খ্রিস্টাব্দে এক শক্তিশালী ভূমিকম্প পেত্রাকে কাঁপিয়ে দেয়। ধ্বংস হয়ে যায় তাদের সুপরিকল্পিত জলব্যবস্থা। যে পানি তাদের শক্তির উৎস ছিল, সেটিই হয়ে ওঠে দুর্বলতার কারণ। পানির সংকট দেখা দিলে মানুষ শহর ছেড়ে যেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে পেত্রা পরিণত হয় জনশূন্য নগরীতে।
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বন্যা, ভূমিকম্প ও মরুভূমির বালুঝড় পেত্রাকে আরও ধ্বংস করে দেয়। একসময় এই নগরী সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায় মানুষের স্মৃতি থেকে। বালুর স্তরে ঢেকে যায় এর অস্তিত্ব, ইতিহাস হয়ে পড়ে অজানা।
দীর্ঘ সময় পর, ১৯১২ সালে, এক সুইস অভিযাত্রী ছদ্মবেশে এই হারানো শহর পুনরাবিষ্কার করেন। তার এই আবিষ্কার বিশ্বকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয় পেত্রার সঙ্গে। ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে এই বিস্ময়কর নগরী।
আজ পেত্রা আর জনবসতিপূর্ণ শহর নয়, তবে এটি মানব সভ্যতার এক অনন্য নিদর্শন। এটি প্রমাণ করে, প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে মানুষ কতদূর এগোতে পারে, আবার সময়ের নির্মমতায় কত সহজেই সব হারিয়ে যেতে পারে।