ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সরকার গঠন ও মন্ত্রণালয় পুনর্বিন্যাসের আনুষ্ঠানিকতা সামনে থাকলেও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে নতুন প্রত্যাশার আলোচনা। বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা নতুন সরকারের কাছে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও পরিকল্পনাভিত্তিক ক্রীড়া প্রশাসন গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন।
দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান নানা সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সুশাসন ও ইতিবাচক পরিবেশ- এমনটাই মনে করেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন-এর মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, নতুন সরকারের কাছে ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের প্রত্যাশা খুবই স্পষ্ট। দেশে এমন একটি ক্রীড়াবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে খেলাধুলা নির্বিঘ্নে এগিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি জেলা, বিভাগ ও বিভিন্ন ফেডারেশনে ঝুলে থাকা নির্বাচনগুলো দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতি আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন-এর সহসভাপতি ফাহাদ করিম বলেন, সরকারের কাছে তাদের মূল চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা চান খেলাধুলা পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে এনে অবকাঠামো উন্নয়ন ও টেকনিক্যাল টিমে বিনিয়োগ বাড়ানো হোক। মাঠ, স্টেডিয়াম এবং স্কুল পর্যায় থেকেই খেলাধুলাভিত্তিক কার্যক্রম চালুর ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ক্রীড়াবান্ধব মানসিকতা গড়ে উঠবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন-এর সাধারণ সম্পাদক রাসেল কবির। তিনি বলেন, সামনে কমনওয়েলথ গেমস ও এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসর রয়েছে। এসব প্রতিযোগিতার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিতে ফান্ডিং অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত অর্থসহায়তা পেলে খেলোয়াড়রা উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনতে সক্ষম হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা ও নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন-এর সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) রিয়াজুল হাসান। তিনি বলেন, খেলোয়াড়রা যাতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পায় এবং নিয়মিত অনুশীলনের জন্য মানসম্মত মাঠ ও অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ পায়, সে বিষয়ে নতুন সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন। ক্রীড়াঙ্গনের ভিত্তি মজবুত করতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকেই খেলাধুলার চর্চা বাড়াতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একই ধরনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশন-এর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশি কোচ নিয়োগে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্তত পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সুস্পষ্ট ক্রীড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণেরও পরামর্শ দেন তিনি।
ক্রীড়া প্রশাসনে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশন-এর সাধারণ সম্পাদক এমএ কুদ্দুস খান বলেন, নতুন সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা- যিনি ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তিনি যেন ক্রীড়াবান্ধব মানসিকতার অধিকারী হন। এতে ক্রীড়া-সংশ্লিষ্টদের সমস্যা ও চাহিদা বোঝা সহজ হবে এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
গ্রামাঞ্চলে খেলাধুলার বিস্তার ঘটানোর ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশন-এর সাধারণ সম্পাদক বিমল ঘোষ। তিনি বলেন, ফেডারেশনগুলোতে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন জরুরি। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন ক্রীড়া কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
সামগ্রিকভাবে ক্রীড়া সংগঠকদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাবে। তাদের মতে, বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের সাফল্য অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।
নতুন সরকারের অধীনে ক্রিকেট ও ফুটবলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবিই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ক্রিকেট ও ফুটবল বোর্ডে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্ব বণ্টন নির্ধারণের পাশাপাশি বোর্ডগুলোর কার্যক্রম সাধারণ জনগণের কাছে দৃশ্যমান করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ক্রিকেটে বিসিবির নতুন নেতৃত্বের লক্ষ্য হলো বিপিএল-এ পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা, স্টেডিয়ামের মানোন্নয়ন এবং বিশ্বকাপে দলের নিরাপদ ও দক্ষ পারফরম্যান্স নিশ্চিত করা।
ফুটবলে মূল জোর থাকবে বয়সভিত্তিক দলের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের কোচিং এবং ঘরোয়া লিগের শক্তিশালীকরণে। অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতি রোধ এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের নিরাপত্তা বজায় রাখা নতুন সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এছাড়া তৃণমূল থেকে মেধাবী খেলোয়াড়দের আবিষ্কার, আধুনিক কোচিং পরিকাঠামো তৈরি এবং ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে দেশকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতামূলক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।