Ridge Bangla

কেরালা মডেল: কীভাবে একটি রাজ্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভারতের বাকি অংশকে ছাড়িয়ে গেল?

​উন্নয়ন বলতে সাধারণত আমরা বিশাল সব কলকারখানা, আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর দ্রুত জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে বুঝি। কিন্তু ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের ছোট্ট একটি রাজ্য ‘কেরালা’ গত কয়েক দশকে এই সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছে। কেরালা প্রমাণ করেছে যে, খুব বেশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ছাড়াও কেবল সঠিক জননীতি এবং সামাজিক বিনিয়োগের মাধ্যমে কীভাবে একটি উন্নত সমাজ গড়া সম্ভব। বিশ্বজুড়ে যা এখন ‘কেরালা মডেল’ নামে পরিচিত।

​কেরালা মডেল হলো উন্নয়নের এমন একটি দর্শন যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এই মডেলের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যেখানে ভারতের অনেক শক্তিশালী অর্থনীতির রাজ্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় পিছিয়ে আছে, সেখানে কেরালা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, লিঙ্গ সমতা এবং গড় আয়ুর মতো সূচকগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

​কেরালার সাফল্যের প্রধান ভিত্তি হলো শিক্ষা। ভারতের গড় সাক্ষরতার হার যেখানে প্রায় ৭৭ শতাংশ, সেখানে কেরালা ৯৪ শতাংশের বেশি  স্বাক্ষরতা অর্জন করেছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। উনিশ শতকের সমাজ সংস্কারকদের আন্দোলন এবং পরবর্তীতে রাজ্য সরকারের শিক্ষাখাতে বিপুল ব্যয় এই পরিবর্তন এনেছে। কেরালার শিক্ষার একটি বিশেষ দিক হলো নারী শিক্ষা। এখানে নারী ও পুরুষের সাক্ষরতার হারে ব্যবধান নেই বললেই চলে। যখন একটি সমাজের নারীরা শিক্ষিত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে পরিবার পরিকল্পনা, শিশুর পুষ্টি এবং সামগ্রিক সচেতনতায়। কেরালার প্রতিটি গ্রামে অন্তত একটি করে পাবলিক লাইব্রেরি থাকা এই মডেলের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য।

​কেরালার স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য কোনো বড় বড় চটকদার হাসপাতালের ওপর নির্ভর নয়, বরং এটি দাঁড়িয়ে আছে শক্তিশালী ‘প্রাইমারি হেলথ সেন্টার’ (PHC) বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ওপর। কেরালায় শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে মাত্র ৬, যা ভারতের জাতীয় গড়ের (প্রায় ২৮) চেয়ে অনেক কম। কেরালাবাসীর গড় আয়ু ৭৫ বছরের বেশি, যা ভারতের সর্বোচ্চ। নিপাহ ভাইরাস বা কোভিড-১৯ মহামারির সময় কেরালা যেভাবে স্থানীয় পঞ্চায়েত ও স্বেচ্ছাসেবীদের কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এখানে স্বাস্থ্যসেবা কেবল ধনীদের অধিকার নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া এক সেবা।

​কেরালা মডেলের অন্যতম স্তম্ভ হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ১৯৯৬ সালে কেরালা সরকার ‘পিপলস প্ল্যান ক্যাম্পেইন’ শুরু করে, যার মাধ্যমে রাজ্যের বার্ষিক বাজেটের প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ সরাসরি স্থানীয় পঞ্চায়েত ও পৌরসভার হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে গ্রামের মানুষ নিজেরাই ঠিক করতে পারে তাদের কোথায় রাস্তা দরকার বা কোথায় স্কুল সংস্কার করা প্রয়োজন। এই স্বচ্ছতা ও সরাসরি অংশগ্রহণই উন্নয়নকে টেকসই করেছে।

​ভূমি সংস্কার ও সামাজিক ন্যায়বিচার

​কেরালা মডেলের সাফল্যের পেছনে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সফল ভূমি সংস্কারের বড় ভূমিকা রয়েছে। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে ভূমিহীন কৃষকদের হাতে জমি তুলে দেওয়া হয়েছিল। এটি গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন এবং নিচুতলার মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা বোধ তৈরি করেছিল। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের ফলে কেরালায় বর্ণবাদ বা সাম্প্রদায়িক বিভেদ ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অনেক কম।

​কেরালার অর্থনীতির একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ (Remittance) থেকে। এই রেমিট্যান্স কেরালায় দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রেখেছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছে। এই অর্থ সরাসরি মানুষের ভোগ ও গৃহ নির্মাণে ব্যয় হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি সচল থাকে।

​এত সাফল্য সত্ত্বেও কেরালা মডেল কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কেরালায় শিক্ষিত বেকারের হার অনেক বেশি। উচ্চশিক্ষিত তরুণরা রাজ্যে উপযুক্ত কাজ না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় কেরালা সেরা হলেও ভারী শিল্প স্থাপনে রাজ্যটি এখনো পিছিয়ে আছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির কারণে কেরালায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য বাজেটে চাপ তৈরি করবে।

​কেরালা মডেল আমাদের শেখায় যে, উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে যে সমাজ গড়ে ওঠে, তা যেকোনো সংকটে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সহনশীল হয়। ভারতের অন্যান্য রাজ্য তো বটেই, বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য কেরালা মডেল আজ এক অনুকরণীয় উদাহরণ। জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, বরং ‘হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স’ বা মানব উন্নয়ন সূচকই যে উন্নয়নের আসল মাপকাঠি- কেরালা তার জীবন্ত প্রমাণ।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন