ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ায় দীর্ঘ ২০ বছর পর সরকার গঠনের পথে এগোচ্ছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি বা তার কাছাকাছি সময়ে নতুন সরকার গঠন করা হবে। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিমধ্যেই নতুন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের জন্য ৪৫টি গাড়ি প্রস্তুত করেছে।
নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে দেশে ইতিমধ্যেই জল্পনা-আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সচিবালয়, আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যে চায়ের দোকানেও চলছে কৌতূহল- কে কোন মন্ত্রণালয় পাবেন? বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাবেন দলের পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য নেতারা। এছাড়া মিত্র দলের শীর্ষ নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, যা জাতীয় সরকারের আদলে মন্ত্রিসভা গঠনের ইঙ্গিত দেয়। উচ্চশিক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন ইমেজধারী তরুণ সংসদ সদস্যরাও মন্ত্রী হতে পারেন।
মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সম্ভাব্য নেতাদের মধ্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম শীর্ষে রয়েছে। ২০০১ সালে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এবার তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় পান কি না, তা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয়।
ঢাকা-৮ আসনের বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সম্ভাবনা রাখছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে রাখা হতে পারে, যেখানে তিনি পূর্বেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় হতে পারে ড. আব্দুল মঈন খানের। আর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে পররাষ্ট্র বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০০১ সালের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর কাছে দেওয়া হতে পারে।
আইন বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়েও আলোচনা চলছে। এখানে সম্ভাব্য নাম হিসেবে রয়েছে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় হতে পারে ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের। সিরাজগঞ্জ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. এম এ মুহিতকে রাখা যেতে পারে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে সম্ভাব্য নাম ড. রেজা কিবরিয়া। টেকনোক্র্যাট কোটায় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হতে পারেন। এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল।
চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয় পেতে পারেন। কৃষিমন্ত্রণালয় হতে পারে কৃষক দলের সাবেক আহ্বায়ক শামসুজ্জামান দুদুর। শ্রম মন্ত্রণালয় হিসেবে আলোচনায় আছেন অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল, প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন খন্দকার আবু আশফাক। শিক্ষা মন্ত্রণালয় পেতে পারেন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সম্ভাব্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া।
মহিলা নেত্রীদের মধ্যে শামা ওবায়েদ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন, আর অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রাখছেন। যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পেতে পারেন। তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পেতে পারেন চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
বিএনপির জোট শরিকদের মধ্যে আন্দালিব রহমান পার্থ, ববি হাজ্জাজ, নুরুল হক নূর, জোনায়েদ সাকির মতো নেতাদের মন্ত্রিসভায় থাকতে দেখা যেতে পারে। এছাড়া শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, রকিবুল ইসলাম বকুল, আজিজুল বারী হেলাল, ব্যারিস্টার মীর হেলালদের নামও আলোচনায় রয়েছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার পদেও আলোচনা চলছে। মুলাদী-বাবুগঞ্জ থেকে নির্বাচিত বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এই পদে বসতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মন্ত্রিসভা হবে পরীক্ষিত নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত। জোট শরিকদেরও পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্রুত নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক সেবার ক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ২০ বছরের বিরতির পর সরকার গঠনের এই প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচিত করবে।