Ridge Bangla

কেন আফগানিস্তানকে ‘পরাশক্তিদের কবরস্থান’ বলা হয়?

মধ্য এশিয়ার হৃদয়ে অবস্থিত পর্বতমালা আর মরুপ্রবাহে ঘেরা প্রাচীন খোরাসানের অংশ আফগানিস্তান। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে দেশটিকে ছুঁয়ে গেছে সাম্রাজ্যের লোভ, শক্তিধর রাষ্ট্রের বিজয়স্পৃহা। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, বারবারই পরাশক্তিদের সেই স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে এই রুক্ষ পাহাড়ের ঢালে, অক্লান্ত যোদ্ধাদের সীমাহীন প্রতিরোধে। তাই যেন ইতিহাস আফগানিস্তানকে এক অদ্ভুত উপাধি দিয়েছে- পরাশক্তিদের কবরস্থান।

মাসখানেক আগে পাক-আফগান উত্তেজনার মধ্যে বিরল ভারত সফরে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির একটি উক্তি আফগানিস্তানের সাথে সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিদেরকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তিনি পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোকে জিজ্ঞাসা করুন- আফগানিস্তানের সঙ্গে খেলা ভালো কিছু নিয়ে আসে না।”

পাকিস্তানকে দেয়া এই হুঁশিয়ারি যেন ইতিহাসেরই এক নীরব প্রতিধ্বনি। কেন এ কথা বলেন তিনি? কেনই বা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সাম্রাজ্যগুলো এই ভূখণ্ডে এসে সামরিক বিজয়ের মুকুট পরার বদলে কেবল পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ফিরে গেছে?

আফগানিস্তানে পরাশক্তিদের পরাজয় নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমেই তাদের আর্থ-সামাজিক ও মানবিক অবস্থানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আফগানিস্তানের ভূগোল কঠিন, সেখানকার মানুষ আরও কঠিন। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যখন তার সাম্রাজ্য বিস্তার করতে এসে পৌঁছলেন ব্যাকট্রিয়া (Bactria) অঞ্চলে, তখন তিনি প্রথম দেখলেন এই ভূমির অনমনীয় চরিত্র। বহু যুদ্ধ জেতা আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী আফগান গোত্রীয় যোদ্ধাদের গেরিলা কৌশলে বিপর্যস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত সেই অঞ্চল দখল করতে পারলেও সৈন্য হারিয়ে, সময় হারিয়ে, শক্তি খরচ করে তার স্বপ্নের অর্ধেক ভেঙেছিল এখানেই।

উনিশ শতকে ব্রিটিশরা যখন ‘গ্রেট গেম’-এ রুশদের মোকাবিলায় আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইল, তখন তারা বুঝতে পারল- এ দেশ কাগজে-কলমে দখল করা গেলেও বাস্তবে সম্ভব নয়।

১৮৪২ সালে প্রথম ইংরেজ-আফগান যুদ্ধের শেষ দৃশ্যটি সম্ভবত বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর পরাজয়ের প্রতীক। পুরো সেনাদল নিয়ে কাবুল ছাড়লেও জালালাবাদের পথে ফিরেছিলেন মাত্র ডা. উইলিয়াম ব্রাইডন; আহত, ক্লান্ত, মৃতের মতো এক মানুষ। বাকি সকল সৈন্য নিহত। এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের মাথা নিচু করে দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল।

শত বছরের বেশি সময় পরে, ১৯৭৯ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন মনে করেছিল- তাদের আধুনিক সামরিক শক্তি পাহাড়ি অঞ্চলে গেরিলা যোদ্ধাদের সহজেই দমন করতে পারবে। কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে আফগান মুজাহিদিনদের তীব্র গেরিলা প্রতিরোধ, কঠিন ভৌগলিক অবস্থান, জনসমর্থন-ভিত্তিক লড়াইয়ের সাথে পাকিস্তান, আমেরিকার ত্রিমুখী খেলায় ১৯৮৯ সালে যখন সোভিয়েত বাহিনী ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে দেশটি ছাড়তে বাধ্য হলো, তখন পড়াক্রমশালী সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব ধুলো জমা অতীত হয়ে যেতে শুরু করেছে।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের টুইন টাওয়ারে হামলার পর তালেবানকে সরিয়ে তথাকথিত গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র, বিপুল সেনা, ক্ষমতাধর নানা রাষ্ট্রের সমর্থন- সবই ছিল তাদের পক্ষে। কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর পরে তারাও বুঝল- আফগানিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধে আধুনিক অস্ত্র ও শক্তি নয়, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও স্থানীয় বাস্তবতার বোঝাপড়াই আসল শক্তি।

২০২১ সালে দ্রুতগতিতে আমেরিকান বাহিনী প্রত্যাহার ও তালেবানের পুনরুত্থান বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিল- আফগানিস্তানকে শক্তি দিয়ে দমন করা যায় না। পাহাড়ি পথ, গোত্রীয় ঐক্য এবং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে গভীর দেশপ্রেম দেশটিকে করে তুলেছে অজেয়।

কেন আফগানিস্তানকে পরাশক্তিদের কবরস্থান বলা হয়- এ নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূগোল বিশ্লেষকরা নানা সময়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। বিশেষজ্ঞরা আফগানিস্তানের ভূমিতে পরাশক্তিদের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পেছনে কিছু মৌলিক কারণ খুঁজে পান।

ভৌগলিক অবস্থান: দুর্গম পর্বতমালা ও অপ্রবেশ্য উপত্যকা বিদেশি সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করে ফেলে।

গেরিলা যুদ্ধকৌশল: আফগান যোদ্ধাদের যুদ্ধশৈলী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই অঞ্চলের জন্য সেরা যুদ্ধকৌশলে বিবর্তিত হয়েছে।

গোত্রভিত্তিক সমাজ: বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত থাকায় আফগানিস্তানে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন কঠিন, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন।

বিদেশি শক্তির প্রতি অবিশ্বাস: ইতিহাস আফগানদের শিখিয়েছে- অন্যের উপস্থিতি মানেই দখল।

দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের ক্ষমতা: আফগানরা যুদ্ধকে জীবনধারণ ও জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, যা বড় শক্তির পক্ষে করা সম্ভব নয়।

পৃথিবীর বুকে আফগানিস্তান কেবলই একটি ভূখণ্ড নয়, দেশটি যেন একইসাথে এর বাসিন্দাদের দৃঢ় মানসিকতারও প্রতিশব্দ। পর্বতের মতোই কঠিন তা, অনমনীয় মরুর মতোই। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে সে পরাশক্তিদের শিখিয়েছে এক চিরন্তন সত্য- সামরিক শক্তি দিয়ে সব দেশ জয় করা যায় না। কিছু দেশকে উপলব্ধি করা যায় তাদের মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি, আর স্বাধীনতার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে।

This post was viewed: 13

আরো পড়ুন