Ridge Bangla

কুর্দি: যাদের কোনো দেশ নেই

​মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রের দিকে তাকালে আপনি এক বিশাল জনগোষ্ঠীর পদচারণা দেখতে পাবেন, যাদের নিজস্ব ভাষা আছে, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আছে, এমনকি আছে হাজার বছরের ইতিহাস। কিন্তু নেই কেবল একটি নিজস্ব সার্বভৌম ভূখণ্ড। তারা হলেন কুর্দি। প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার কোটি জনসংখ্যার এই জাতিগোষ্ঠীকে বলা হয় ‘বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জাতি’। ইতিহাসে তারা বারবার বীরত্ব দেখিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে, কিন্তু দিনশেষে যখন পাওনার হিসাব এসেছে, বিশ্ব রাজনীতি তাদের দুহাত ভরে দিয়েছে কেবল বঞ্চনা।

​ভৌগোলিকভাবে কুর্দিরা যে অঞ্চলে বাস করে তাকে বলা হয় ‘কুর্দিস্তান’। এটি মূলত তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব, ইরাকের উত্তর, সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব এবং ইরানের পশ্চিম অংশের একটি পার্বত্য অঞ্চল। পাহাড়ই কুর্দিদের পরম বন্ধু। তাদের একটি জনপ্রিয় প্রবাদ আছে, “পাহাড় ছাড়া আমাদের আর কোনো বন্ধু নেই।” ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, কুর্দিরা মূলত আর্য বংশোদ্ভূত মেদ জাতির উত্তরসূরি। সালাহউদ্দিন আইয়ুবির মতো কিংবদন্তি সেনাপতি ছিলেন এই কুর্দি জাতিরই গর্ব।

​কুর্দিদের এই রাষ্ট্রহীন অবস্থার সূত্রপাত ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। ১৯২০ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ‘সেভ্রেস চুক্তি’ (Treaty of Sèvres) স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে কুর্দিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাত্র তিন বছর পর ১৯২৩ সালে ‘লোজান চুক্তি’র (Treaty of Lausanne) মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি ধূলিসাৎ হয়ে যায়। নতুন এই চুক্তিতে তুরস্কের বর্তমান সীমানা নির্ধারিত হয় এবং কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। কোনো এক জাদুকরী কলমের আঁচড়ে রাতারাতি এক বিশাল জাতি তাদের ভিটেমাটিতেই ‘সংখ্যালঘু’ ও ‘বিদেশি’ হয়ে পড়ে।

​কুর্দিদের সবচেয়ে বড় অংশটি বাস করে তুরস্কে। কয়েক দশক ধরে তুর্কি সরকার কুর্দিদের জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। একসময় তুরস্কে কুর্দি ভাষা ও পোশাকও নিষিদ্ধ ছিল। কুর্দিদের অধিকার আদায়ের সশস্ত্র সংগঠন পিকেকে (PKK)-এর সাথে তুর্কি সেনাবাহিনীর লড়াইয়ে গত কয়েক দশকে হাজার হাজার প্রাণ ঝরেছে।

​ইরাকে কুর্দিদের ইতিহাস আরও রক্তক্ষয়ী। ১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে কুর্দিদের ওপর চালানো হয়েছিল নৃশংস ‘আনফাল অভিযান’। ১৯৮৮ সালে হালাবজা শহরে রাসায়নিক গ্যাস হামলায় মুহূর্তেই প্রাণ হারায় ৫০০০-এর বেশি কুর্দি। তবে বর্তমানে ইরাকের কুর্দিরা কিছুটা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে, যা তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল।

​সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে কুর্দিরা ছিল সবচেয়ে সক্রিয় ও কার্যকর শক্তি। উত্তর সিরিয়ায় ‘রোজাভা’ নামক অঞ্চলে তারা এক অনন্য গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিন্তু সেখানেও তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বাশার আল-আসাদ সরকারের বৈরিতা তাদের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে। ইরানেও কুর্দিরা নিয়মিত রাজনৈতিক নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে।

​সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস (IS)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে কুর্দি যোদ্ধারা, বিশেষ করে কুর্দি নারী যোদ্ধারা (YPJ) বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। কোবানি থেকে শুরু করে রাক্কা- প্রতিটি রণাঙ্গনে কুর্দিরাই ছিল সামনের সারির যোদ্ধা। আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব যখন আইএসের ভয়ে তটস্থ ছিল, তখন কুর্দিরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের রুখে দিয়েছিল। কিন্তু আইএসের পতনের পর আবারও যেন সেই পুরনো দৃশ্যপটের পুনরাবৃত্তি ঘটল। কুর্দিরা যখন তুরস্কের আক্রমণের শিকার হলো, তখন তাদের পুরনো মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিল। বিশ্ব রাজনীতির এই দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার করুণ ইতিহাস কুর্দিদের ললাটলিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​কুর্দিদের কোনো দেশ নেই, কিন্তু তাদের একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদ আছে। তারা তুরস্কের কাছে ‘পাহাড়ি তুর্কি’, আর ইরানের কাছে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’। চারপাশের প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের ভয় পায়, পাছে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন রাষ্ট্র গড়ে তোলে।

আধুনিক এই বিশ্বব্যবস্থায় চার কোটি মানুষের কোনো পরিচয় থাকবে না, এটি যেমন এক মানবতাবাদী সংকট, তেমনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক বড় ব্যর্থতা। পাহাড়ের বুক চিরে কুর্দিরা আজও গাইছে স্বাধীনতার গান, যে গানটির সুর হয়তো কোনো একদিন আন্তর্জাতিক সীমানার কাঁটাতার টপকে একটি নতুন পতাকা উড়াতে সাহায্য করবে। ​ততদিন পর্যন্ত কুর্দিরা থেকে যাবে ইতিহাসের সেই যাযাবর পথিক, যাদের হৃদয় জুড়ে দেশ থাকলেও মানচিত্রে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন