বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কারা হেফাজতে বন্দিদের মৃত্যু মিছিল থামছে না। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও কারাগার থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত কয়েক মাসে বন্দি মৃত্যুর হার আবারও উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। কারা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত চার বছরে দেশে মোট ৬৩২ জন বন্দি কারা হেফাজতে মারা গেছেন।
বিশেষ করে পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের শাসনামলে যেখানে কারাগারে বন্দিদের মৃত্যু ভয়ানক অবস্থায় পৌঁছেছিল, সেখানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেল প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের বড়সড় সংস্কারের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে দেশে ১৮৫ জন বন্দি মারা যান। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৫৫ জন। ২০২৪ সালে কিছুটা কমে ১২০ জন হলেও সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালে তা আবার লাফিয়ে বেড়ে ১৭২ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৬ জন বন্দি আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে অসুস্থতা বা হার্ট অ্যাটাকের কথা জানানো হয়। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসার অভাব ও নির্যাতনের ফলেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটছে। স্বাধীন, নিরপেক্ষ তদন্তের অভাব এবং ময়নাতদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় প্রকৃত সত্য আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন কারাগারে রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ কয়েদিদের মৃত্যুর খবর দেশের জাতীয় গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর আগে নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়েছে স্বজনদের পক্ষ থেকে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও কারা প্রশাসনের ভেতরে থাকা বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং জবাবদিহিতার অভাবই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় লোকবল ও সরঞ্জামের অভাবে সঠিক সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয়। কারা তথ্য বলছে, দেশে ৭৫টি কারাগারের বিপরীতে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি, যা জরুরি মুহূর্তে বন্দিদের হাসপাতালে নিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া কারাগারগুলোতে ১৪১ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বন্দিদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন এবং জেল কোডের আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি। যদি এখনই এই সংস্কৃতি বন্ধ করা না যায়, তবে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।