Ridge Bangla

কারাভোগ শেষ, তবু মুক্তি নেই বাদল ফরাজির

ভারতে দীর্ঘ কারাভোগ শেষে দেশে ফিরেও মুক্তি মিলছে না বাদল ফরাজির। ভুল পরিচয়ে গ্রেপ্তার হয়ে এক যুগের বেশি সময় কারাগারে কাটানো এই তরুণের জীবন আজও বন্দিদশায় আটকে আছে আইনি জটিলতার জালে। ফলে আইন, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

২০০৮ সালে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের সময় ‘বাদল সিং’ নামের এক আসামীর সাথে নামের মিলের কারণে বাদল ফরাজিকে গ্রেপ্তার করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তিনি তখন পর্যটক ভিসা নিয়ে বাগেরহাট থেকে তাজমহল দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভারতে প্রবেশের পর পরই তাকে একটি হত্যা মামলার আসামি দাবি করে আটক করা হয়। অথচ যে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে তাকে দণ্ডিত করা হয়, সেটি ঘটেছিল তিনি ভারতে যাওয়ার আগেই।

পরবর্তীতে ২০১৫ সালে দিল্লির সাকেত আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। উচ্চ আদালতে আপিল করেও তিনি মুক্তি পাননি। দীর্ঘদিন দিল্লির তিহার কারাগারে বন্দি থাকার সময় বাদল পড়াশোনা চালিয়ে যান, এবং মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক সম্পন্ন করেন।

বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে ২০১৮ সালের ৬ জুলাই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তখন ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে, নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত এই তরুণ দেশে ফিরে মুক্তি পাবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দেশে ফেরার পরও তাকে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রাখা হয়।

চলতি বছরের ২০ জুলাই তার ১৪ বছরের সাজা পূর্ণ হয়েছে। ভারতীয় আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির ১৪ বছর ‘প্রকৃত কারাবাস’ শেষে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনার আওতায় আসে। তবে মুক্তি স্বয়ংক্রিয় নয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।

কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাদলের মুক্তির বিষয়ে ভারত সরকারের মতামত চেয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার সুভাষ কুমার ঘোষ বলেন, ভারত সরকারের সম্মতি পেলেই তাকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেওয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, বাদলের সাজা কোন দেশের আইনে কার্যকর হবে, তা নিয়েও দ্বিধা রয়েছে। ভারতের আইনে যাবজ্জীবন সাজা সাধারণত ১৪ বছরের কারাভোগের পর বিবেচনায় আসে, অন্যদিকে বাংলাদেশের আইনে তা ৩০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এই আইনি পার্থক্যই জটিলতা আরও বাড়িয়েছে।

এদিকে বাদল ফরাজির পরিবার চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তার ৭১ বছর বয়সী মা শেফালি বেগম শয্যাশায়ী অবস্থায় ছেলের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। ছেলের মুক্তির আশায় দিন গুনতে গুনতে তার বাবা ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। পরিবারের একমাত্র বোনটি বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে ভাইয়ের মুক্তির আবেদন জানিয়ে চলেছেন।

শেফালি বেগম বলেন, “আমার ছেলেটা নির্দোষ। তাকে দেশে আনার সময় বলা হয়েছিল মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু আজও সে কারাগারে। আমি শুধু চাই, ছেলেকে একবার মুক্ত অবস্থায় দেখতে।”

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, নির্দোষ হিসেবে চিহ্নিত একজন ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা মানবাধিকারের পরিপন্থী। তাদের মতে, ভারতে থাকলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপে বাদল হয়তো আগেই মুক্তি পেতেন এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগ পেতেন।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাদলের মুক্তির জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। সেখানে তার কারাবাসের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া, আচরণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বাদল বর্তমানে কারাগারে অন্য বন্দিদের পড়াশোনা শেখানোর কাজ করছেন। সহবন্দিদের মধ্যে তিনি একজন শিক্ষিত ও সহায়ক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তার নিজের জীবনের মুক্তি এখনো অনিশ্চিত।

দীর্ঘ কারাভোগ শেষে এখনো মুক্তি না পাওয়ায় বাদল ফরাজির বিষয়ে মানবিক বিবেচনায় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। আইনমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, ভুল পরিচয়ে আটক হওয়া এই যুবকের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ইতোমধ্যে কারাগারে কেটে গেছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের আন্তঃদেশীয় মামলায় দ্রুত সমন্বয় জরুরি। দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়ার সমন্বয় না হলে একজন নিরপরাধ ব্যক্তির জীবন এভাবেই ঝুলে থাকতে পারে।

This post was viewed: 19

আরো পড়ুন